ফুটপাত উচ্ছেদে কর্মহীন সাড়ে ৪ হাজার তরুণ, বিকল্প পুনর্বাসনের দাবিতে ফুসে উঠছেন ব্যবসায়ীরা
নগরীর সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষা ও সৌন্দর্যায়নে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের উচ্ছেদ অভিযানে নতুন করে অন্তত সাড়ে চার হাজার ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একটি বড় অংশ স্থানীয় বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্যোক্তা। বিকল্প কোনো পুনর্বাসন ব্যবস্থা না করে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনের দোকানপাট হঠাৎ তুলে দেওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে হাজারো পরিবার।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর সাহেববাজার, জিরোপয়েন্ট, সিএন্ডবি মোড়, লক্ষ্মীপুর এবং নিউ মার্কেট এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে অভিযান চালাচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে নেওয়া এই প্রশাসনিক উদ্যোগের সুফল ও কুফল নিয়ে তৈরি হয়েছে বহুমুখী আলোচনা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ:-
পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনা করতেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী মো. তানজিম। তিনি বলেন, "নিজের খরচ চালানো ও পরিবারকে সামান্য সহযোগিতার জন্য ফুটপাতে ছোট একটি ব্যবসার ওপর নির্ভর করতাম। কিন্তু এখন ভ্রাম্যমাণ আদালত সরকারি-বেসরকারি কোনো স্থাপনার সামনেই বসতে দিচ্ছে না। দোকান উচ্ছেদ করায় আমাদের আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—উচ্ছেদের আগে অন্তত নির্দিষ্ট কোনো খালি জায়গায় আমাদের স্থানান্তর বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক।"
পথচারীদের স্বস্তি ও মিশ্র অনুভূতি:-
নিয়মিত যাতায়াতকারী পথচারী মোসা. রেহানা পারভীন বলেন, "ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হতো, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। উচ্ছেদের ফলে এখন নিশ্চিন্তে ও স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যাচ্ছে, যানজটও অনেক কমেছে। তবে যারা উচ্ছেদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে বহু অল্পবয়সী ছেলে রয়েছে। তাদের জন্য ছুটির দিনে 'হলিডে মার্কেট' বা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলে তারা অন্তত জীবন ধারণের সুযোগ পেত।"
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতঃ-
সাহেববাজার এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, "নগরীকে পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত রাখতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিকল্প নেই। তবে হুট করে হাজার হাজার তরুণকে বেকার করে দিলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার ভারসাম্য রাখা জরুরি।"
সুশীল সমাজের পর্যবেক্ষণ:-
রাজশাহীর নাগরিক অধিকারকর্মী ও বিশিষ্ট সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ মনে করেন, কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া হকার উচ্ছেদ টেকসই সমাধান নয়। নাগরিক অধিকার মঞ্চের এক সমন্বয়ক বলেন, "নগর উন্নয়ন ও ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা আইনসম্মত পদক্ষেপ। কিন্তু এই ব্যবসার সাথে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত। কোনো মাস্টারপ্ল্যান বা সুনির্দিষ্ট অঞ্চল (যেমন: ভেন্ডিং জোন) নির্ধারণ ছাড়া এমন গণ-উচ্ছেদ সামাজিক সংকট তৈরি করে। প্রশাসনকে অবিলম্বে হকারদের শুমারি করে তালিকা তৈরি করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।"
সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:-
উচ্ছেদ অভিযান ও সামগ্রিক বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, "নগরীকে তিলোত্তমা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পথচারী বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। ব্যস্ততম ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করায় সাধারণ মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমরা নীতিগতভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিপক্ষে নই, তবে সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা রাসিকের প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ বা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সান্ধ্যকালীন ও হলিডে মার্কেট চালু করা যায় কিনা, তা নিয়ে নীতিগতভাবে চিন্তাভাবনা করছি।"
সুফল ও সামাজিক কুফলের দ্বিমুখী চিত্র:-
মূল দিক অর্জিত সুফলসৃষ্ট সংকট ও কুফল
নগর ব্যবস্থাপনামূল সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে; যানজট হ্রাস পেয়েছে।হাজার হাজার পরিবার ও তরুণ উদ্যোক্তা তাৎক্ষণিকভাবে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
জননিরাপত্তাসড়ক দুর্ঘটনা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে।বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় হতাশা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
নগরবিদদের মতে, রাজপথ দখলমুক্ত রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রক্ষা করার পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে অবিলম্বে 'হকার্স মার্কেট' বা 'স্ট্রিট ভেন্ডিং জোন' গড়ে তোলাই হবে এর একমাত্র টেকসই ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।