৮৫% বাসাবাড়ির পানিতে মলের জীবাণু: উৎস থেকে খাবার পাত্রে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট
দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ বাসাবাড়ির পানের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ও গৃহস্থালি কাজের পানিতে ক্ষতিকর 'ই. কোলাই' (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল (UNICEF)-এর যৌথ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS)-এর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
পানিতে 'ই. কোলাই' ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকা মানেই হলো তা সরাসরি মানুষ কিংবা প্রাণীর মল দ্বারা সংক্রমিত।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, যেখানে পানি উত্তোলন বা শোধন করা হয়—সেই উৎস পয়েন্টেই দূষণের হার প্রায় ৪৭.১ শতাংশ। তবে সেই পানি সরবরাহ লাইন অতিক্রম করে বাসাবাড়ির রিজার্ভ ট্যাঙ্কে পৌঁছানো এবং খাবার পাত্রে ঢালা পর্যন্ত মধ্যবর্তী বিভিন্ন ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি, অনিয়ম ও অসচেতনতার কারণে দূষণের মাত্রা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়ায়।
উৎস থেকে খাবার টেবিলে দূষণের পথ:-
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূগর্ভস্থ পানির লাইনের জরাজীর্ণ অবস্থাকে পানি দূষণের প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহকারী সংস্থার ভূগর্ভস্থ পানির লাইন এবং ম্যানহোল বা ড্রেনেজ স্যুয়ারেজ লাইন বহু স্থানে পাশাপাশি অবস্থিত। পুরোনো ও মরচে ধরা পাইপের ছিদ্র দিয়ে পয়ঃবর্জ্যের দূষিত পানি মূল সরবরাহ লাইনে মিশে যায়। লাইনে পানির চাপ কম থাকলে অধিকাংশ বাসাবাড়িতে সরাসরি পাইপে সাকশন পাম্প সংযোগ করে পানি টানা হয়। এই পাম্পের কৃত্রিম চোষন চাপের ফলে পাইপের লিকেজের চারপাশের ড্রেন ও মাটির ভেতরের ক্ষতিকর তরল সরাসরি লাইনে ঢুকে পড়ে। এছাড়া বাসাবাড়ির ভূগর্ভস্থ ও ছাদের ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেখানে পলি ও শ্যাওলার আস্তরণ জমে 'বায়োফিল্ম' তৈরি হয়, যা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। গ্রামে ও শহরে অপরিষ্কার পাত্রে পানি সংগ্রহ করা এবং খোলা হাতে পানি ছোঁয়ার ফলেও এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের মত:-
জনস্বাস্থ্য ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে 'ই. কোলাই' ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকা মানেই হলো তা সরাসরি মানুষ কিংবা প্রাণীর মল দ্বারা সংক্রমিত। এই জীবাণু কেবল সাধারণ পেটের পীড়া বা ডায়রিয়া তৈরি করে না, বরং শরীরে মারাত্মক বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ কিছু প্রজাতি ক্ষতিকর টক্সিন নির্গত করে মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে দেয়, যা বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হঠাৎ কিডনি অকেজো বা 'হিমোলাইটিক ইউরেমিক সিন্ড্রোম' (HUS) হওয়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া বারবার জীবাণুযুক্ত পানি পানের ফলে পরিপাকতন্ত্র পুষ্টি উপাদান শোষণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ রুদ্ধ করার অন্যতম প্রধান কারণ। এই মলের জীবাণুর সঙ্গে টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই (জন্ডিস) ছড়ানোর হারও বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রশাসনের বক্তব্য ও নাগরিক করণীয়:-
সরবরাহ লাইনে মলের জীবাণু ছড়ানো এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ ও সরবরাহকারী সংস্থা নিজস্ব চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছে।
সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য অপসারণ সুসংহত রাখা তাদের মূল দায়িত্ব হলেও পানিতে জীবাণু থাকার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। বাসাবাড়ির পানির ট্যাঙ্ক পরিচ্ছন্ন রাখতে তারা এলাকাভিত্তিক তদারকি অভিযান পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে শতভাগ শোধন করেই পানি ছাড়া হয়। তবে পুরনো সঞ্চালন লাইনের জরাজীর্ণতা কাটাতে পাইপলাইন পরিবর্তনের মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বাসাবাড়ির নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাঙ্ক পরিষ্কার রাখার দায় গ্রাহকদেরও নিতে হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত থাকতে সাধারণ নাগরিকদের গৃহস্থালি পর্যায়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি ফুটতে শুরু করার পর কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ফুটিয়ে নেওয়া, প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পরপর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পানির ট্যাঙ্ক জীবাণুমুক্ত করা এবং সরবরাহ লাইনে সরাসরি সাকশন পাম্প ব্যবহার না করাই পানিকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পানি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়বদ্ধতা। প্রশাসনিক পর্যায় থেকে পানির সরবরাহ লাইনের আমূল সংস্কার ও সার্বিক তদারকি জোরদারের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।