রান্নার আধুনিকতা উধাও: গ্যাসের চড়া দামে রাজশাহীতে ‘খড়ির যুগে গৃহিণীরা ’

Modernity in cooking is disappearing
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
রান্নার আধুনিকতা উধাও: গ্যাসের চড়া দামে রাজশাহীতে ‘খড়ির যুগে গৃহিণীরা ’
--সংগৃহীত ছবি

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘনঘন মূল্য সমন্বয়ের পসরা—সব মিলিয়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার এখন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কখনো দুই থেকে তিন শ টাকা বৃদ্ধি, আবার কখনো মাত্র ২৫ থেকে ৫০ টাকা হ্রাসের এই অসম ও নড়বড়ে দামের হেরফেরে দিশাহারা উত্তরবঙ্গের প্রধান জনপদ রাজশাহীর সাধারণ মানুষ। গ্যাসের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির ধাক্কায় থমকে গেছে রান্নাঘরের আধুনিকতা; বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো ফিরে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খড়ি বা কাঠের চুলার যুগে।  


​গত এক বছরে (বিশেষ করে ২০২৬ সালের চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়) আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের অজুহাতে দেশের বাজারে এলপিজি গ্যাসের দাম যেন এক অনিয়ন্ত্রিত রোলারে চড়েছে।


 বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে দফায় দফায় গ্যাসের দাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরে রেকর্ড কয়েক দফায় এক লাফে বড় অংকের (যেমন: এপ্রিল মাসে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা এবং পরবর্তীতে অক্টোবরে এক লাফে ২৫২ টাকা) দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিপরীতে স্বস্তি দেওয়ার নামে কমানো হয়েছে মাত্র ১৩ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০-১০০ টাকার মতো সামান্য কিছু অংক।  


​বছরের বিভিন্ন মাসে বিশ্ববাজারের সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) ও ডলারের কারসাজির দোহাই দিয়ে বিগত ১২ মাসে অন্তত ৮ থেকে ৯ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং নামমাত্র ৩ থেকে ৪ বার দাম কমানো হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে দামের সামান্য হেরফের করা হলেও খুচরা বাজারে এর সুফল মেলেনি।

 ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাকে সরকারি দামের চেয়েও অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেট পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।  


রাজশাহী মহানগরীর ​রান্নাঘর থেকে মাঠঘাট, ফিরে এসেছে খড়ির রমরমা ব্যবসা। ​এলপিজির এই লাগামহীন দাম ও তীব্র সংকটের কারণে রাজশাহীতে রান্নাঘরের আধুনিকতা থমকে দাঁড়িয়েছে। নাগাল না পেয়ে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যবাহী কাঠের খড়ির দিকে ঝুঁকছেন, যা নগরীতে ফিরিয়ে এনেছে এক সময় পেছনে ফেলে আসা ‘খড়ির যুগ’। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে চাহিদা বাড়ায় রাজশাহী নগরী ও আশপাশের এলাকায় কাঠের খড়ির রমরমা ব্যবসা জমে উঠেছে।


গ্যাস সংকটকে ​ কেন্দ্র করে রাজশাহী নগরীসংলগ্ন কাশিয়াডাঙ্গা, আমচত্বর, কাটাখালী ও নওহাটাসহ এবং নগরীর শিরোইল,ভদ্রা, বালিয়াপুকুর,জামালপুর, আহা মখদুম থানা এলাকা, মান্দা কলোনি, উপশহর, পদ্মা বাঁধ এলাকা, ষষ্ঠী তলা, কাজিহাতা, বর্ণালীসহ   বিভিন্ন পয়েন্টের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে খড়ির আড়ৎ। 


সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসেব মতে, বর্তমানে পুরো নগরীতে দুই শতাধিক খড়ির আড়ৎ সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি আড়তে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ হাজার টাকার খড়ি বিক্রি হচ্ছে।

​সেই হিসাবে রাজশাহী নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার কাঠখড়ি হাতবদল হচ্ছে, যা মাসের হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকায়। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এলপিজি সিলিন্ডারের উচ্চমূল্যের কারণে মাস শেষে আর বাজেটের হিসেব মেলাতে পারছে না। নিরুপায় হয়েই তাদের আবার মাটির চুলা ও খড়িতে রান্নার পথ বেছে নিতে হচ্ছে।  


​বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও সাধারণেরা বলছেন, তাদের বাস্তব চিত্র। 

​আড়তদার আমজাদ হোসেন (কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা)বলেন, তাঁর আড়তে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মণ খড়ি বিকোচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার টাকার বেশি বেচাকেনা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে খড়ি কিনছে। আগে যারা নিয়মিত গ্যাসে রান্না করতেন, এমন অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার এখন খড়ির গ্রাহক হয়েছেন।  


​আড়তদার মাহবুবুল আলম বলেন, রাজশাহীতে যে কেবল বাসাবাড়িতেই খড়ির ব্যবহার বাড়ছে তা নয়, স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁতেও এর ব্যাপক কদর রয়েছে। বিশেষ করে মৃত আমগাছ ছাড়াও শিশু, মেহগনি, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছের খড়ির চাহিদা সবচাইতে বেশি। এসব খড়ি দিয়ে শহরের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরি করা হচ্ছে এবং সাধারণ ক্রেতারাও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঠের খড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।


​খাইরুন নেছা (কোর্ট চত্বরের কালাই রুটি বিক্রেতা)বলেন,খড়ির বাজারের এই গতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রাজশাহীর বিখ্যাত কালাই রুটির ব্যবসা। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কালাই রুটি তৈরীতে দীর্ঘদিন ধরেই খড়ি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, কারণ আধুনিক গ্যাসের চুলায় এই রুটি তৈরি সম্ভব নয়। কোর্ট ভবনের সামনে দীর্ঘ সময় ধরে কালাই রুটি বিক্রি করে আসা খাইরুন নেছা জানান, "প্রতি মণ খড়ি ৬০০ টাকা দরে কিনে তাঁকে রুটি তৈরি করতে হয়। গ্যাসের চড়া দামের কারণে এখন আমার মতো সাধারণ মানুষদেরকেও খড়ির ওপর বেশি ভরসা করতে হচ্ছে।"

​

উপর শহর এলাকার গৃহিণী মাকসুদা বেগম বলেন, গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে রান্নার কাজে রান্না হিমশিল খাচ্ছে। অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি, মাঝেমধ্যে বাজার থেকে গ্যাস উধাও, একাধিক কারণে তিনি গ্যাসে আর রান্না করছেন না। খড়ী দিয়ে রান্না করছেন। 


বালিয়াপুকুর  এলাকার গৃহিণী মনিরা খাতুন বলেন, গ্যাসের অস্বাভাবিক তে তো আছেই, মাঝে মাঝে বাড়তি টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে ঘড়ির রান্না বেছে নিয়েছেন। 


​উন্নয়ন ও আধুনিকতার সময়ে এসে সাধারণ মানুষের এভাবে কাঠের খড়ির ওপর নতুন করে নির্ভরতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে জ্বালানি সুবিধার দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে বিকল্প জ্বালানির এই কৃত্রিম বাজার আরও প্রসারিত হবে, যা দেশের টেকসই জ্বালানি খাতের বাস্তব সংকট ও দরিদ্রবান্ধব নীতির ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।