স্টেথোস্কোপে রোগের সঙ্গে মানুষের মনের সংকেত পেয়েছিলেন রেবতী সাহা

Revati Mohan Saha
সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০১:১১ অপরাহ্ন সারা বাংলা
সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০১:১১ অপরাহ্ন
স্টেথোস্কোপে রোগের সঙ্গে মানুষের মনের সংকেত পেয়েছিলেন রেবতী সাহা

পল্লী চিকিৎসক রেবতী মোহন সাহা রোগীদের বুকে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে অসুখের উপসর্গ ছাড়াও মানুষের মনের 'অন্তরাত্মা'র সংকেত পেয়েছিলেন।  বুঝেছিলেন, রোগ সারাতে শুধু   ওষুধ নয়, মানুষের  চিত্ত বিনোদনেরও প্রয়োজন আছে। সেই তাগিদে নিজ গ্রামে গড়ে তুললেন আলকাপ গানের দল। নিজ গ্রাম ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে সেই দল পৌঁছে গেল আশেপাশের জেলা-উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে । বিস্তৃত হতে থাকলো লোকসংস্কৃতির একটি ধারা। 


নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার আঘোর গ্রামের বাসিন্দা আলকাপ গানের পরিচালক রেবতী মোহন সাহা (৭৫) গত বছরের  (২০২৫) ২৯ অক্টোবর পরলোকগমন করেছেন। তবে  অনন্তলোকে যাত্রা করার আগে তিনি অসংখ্য আলকাপ  যাত্রা শিল্পী  তৈরি করে গেছেন  । তাঁর হাতে তৈরি শিষ্যরাই এখনও লোকসংস্কৃতির এই ধারাকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় ৭০ জন আলকাপ যাত্রার শিল্পী তৈরি করেছেন। 


লোকসংস্কৃতিতে সামগ্রিক অবদানের  স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে নওগাঁ জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে রেবতী সাহাকে 'জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা' প্রদান করা হয়। 


রেবতী সাহার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ্য শিষ্য  মো. মোসলেম উদ্দিন (৬০)। ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি আলকাপে অভিনয় শুরু করেন। গত কয়েকদিন আগে  কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সঙ্গে ছিলেন রেবতী মোহনের ছোট ভাই তপন সাহা। 


মোসলেম উদ্দিন  গুরু রেবতী মোহন সাহার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন। তিনি জানালেন, দাদার (রেবতী সাহা) রক্তে মিশে ছিল আলকাপ গান। গান-বাজনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। আজ থেকে  ৪৮ বছরের আগের কথা। দাদা আলকাপ গান নিয়ে কিছু একটা করার কথা  ভাবছিলেন। হঠাৎ একদিন  জানতেন পারেন, তাঁরই গ্রামের শীতল চন্দ্রের একটা আলকাপ গানের দল আছে। বিভিন্ন কারণে শীতল সেটা চালাতে পারছিলেন না। রেবতী মোহন দাদা  সেই আলকাপ দলের  পরিচালনার  দায়িত্ব নিলেন। নাম দিলেন 'মহামায়া পঞ্চরস আলকাপ যাত্রা'।  আর এভাবেই নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে গেল 'রেবতী ডাক্তারের আলকাপের' সুনাম। এমনও হয়েছে, লক্ষী পূজা উপলক্ষে  এক রাতের জন্য কোনো এলাকায় আলকাপ করতে  গিয়েছেন। তাঁদের আলকাপ দেখে সেখানেই অনেকে পরের রাতের জন্য বায়না করেন।  এভাবে এক নাগাড়ে  ১০ রাত গান করে তাঁদের  বাড়ি ফিরতে হয়েছে। 


কথায় কথায় জানালেন, তখন হেঁটে হেঁটে আশেপাশের  বিভিন্ন গ্রামে আলকাপ করতে যেতে হতো। তারপরে সাইকেল-ভ্যানে । এখন ভটভটিতে করে যাতায়াত করা হয়।


তিনি জানালেন, আলকাপ যাত্রার কাহিনি দাদা নিজেই লিখতেন। এক নিঃশ্বাসে বলতে লাগলেন- অন্ধ ভিখারী, দাদা নয় দেবতা, নসিব, লক্ষীর হাতে ভিক্ষার ঝুলি, মায়ের প্রাণ, বৌদির চোখে জল, সাধু শয়তানসহ আরও বেশ কয়েকটি কাহিনির নাম। আরও জানালেন, দাদা 'শ্মশানে মিলন' কাহিনির লিখিতরূপ সম্পূর্ণ করতে না পারলেও তিনি মঞ্চরূপ দিয়ে গিয়েছিলেন। সেটাই এখনো মঞ্চস্থ করা হয়। 


 এসব আলকাপ যাত্রার রিহার্সালে হতো রেবতী সাহার বাড়ির আঙিনায়। রিহার্সালে বাড়ির আঙিনাটায় হয়ে উঠতো আসল মঞ্চ। 

 আদর- ভালোবাসা আর শাসন দিয়ে সবাইকে শেখাতেন অভিনয়। 

সেসময় বাংলা বছরের আষাঢ় মাসের রথযাত্রায় শুরু হতো আলকাপ গানের বায়না। তারপরে মনসাপূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষীপূজা, কালীপূজা, রাস উৎসব, নবান্ন উৎসব, সরস্বতী পূজা, আর বাসন্তী পূজা দিয়ে বছর শেষ হতো। এছাড়া  বিভিন্ন মেলাতে ডাক পড়তো আলকাপ যাত্রা করার জন্য। 


রেবতী সাহার ভাই তপন সাহা বলেন, আলকাপ গান করার জন্য  রাত-বিরাতে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। তাই মা রেবতী দাদাকে আলকাপ গান করতে বারণ করতেন। তখন দাদা মাকে  বলতেন, 'আমারতো অন্য কোনো নেশা নেই। গানবাজনাই আমার একমাত্র নেশা।'  সেই থেকে মা দাদাকে আর কিছু বলেননি। 


রেবতী সাহার স্মৃতিচারণ করে তপন সাহা বললেন,'অনেকদিন আগের কথা। উপজেলার   বেলগাপুর গ্রামে আলকাপ গান হবে। সেখানকার স্থানীয় এক আলকাপ দলের সাথে আমাদের দলের প্রতিযোগিতা হবে। আমি সেখানে নারী চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। দর্শক খুব প্রশংসা করেছিল। মঞ্চ থেকে নামার সাথে সাথে দাদা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আজকে তুই আমার মান সম্মান রক্ষা করেছিস। সেই স্মৃতিটা আজও আমার খুব মনে পড়ে।'


 আলকাপ গানের সমসাময়িক অবস্থা  নিয়ে মোসলেম উদ্দিন বললেন, মানুষ আর আগের মতো আলকাপ যাত্রা দেখে না। স্মার্টফোনের কারণে মানুষের আগ্রহ ও মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেছে। এখনকার দর্শকেরা হাতে একটু সময় নিয়ে আলকাপ গান দেখার ধৈর্য একেবারে হারিয়ে ফেলেছে। তবে আশা আছে আলকাপ গানের ভরা সুদিন আবার ফিরে আসবে। মানুষ আবার আলকাপ যাত্রা দেখবে। 


রেবতী সাহার আরেক শিষ্য স্বপন বর্মণ বলেন, তিনি অনেকদিন রেবতী সাহার কাছে আলকাপ গান শিখেছেন। তাঁর কাছে আলকাপ গান শেখার পরে  তিনি নিজেই একটা আলকাপ গানের দল পরিচালনা করছেন। এজন্য তিনি রেবতী সাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।