বাদী চেনেন না, প্রবাসীকে প্রশ্নবিযুক্ত গ্রেপ্তার ॥ সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকের নিরাপত্তা শঙ্কা

The plaintiff is unknown, the expatriate is arrested without question
আবুল কালাম আজাদ ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১২:৪৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১২:৪৮ অপরাহ্ন
বাদী চেনেন না, প্রবাসীকে প্রশ্নবিযুক্ত গ্রেপ্তার ॥ সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকের নিরাপত্তা শঙ্কা
তানোরে ২০২৪ সালের একটি পুরোনো মামলায় প্রবাসী মো. সিরাজুল ইসলামকে (৪৭) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

রাজশাহীর তানোরে ২০২৪ সালের একটি পুরোনো মামলায় প্রবাসী মো. সিরাজুল ইসলামকে (৪৭) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদনে তাঁকে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে চাঁদা দাবি ও মারধরের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলার মূল বাদী নিজেই দাবি করেছেন, তিনি ওই আসামিকে চেনেনই না এবং বিষয়টি তাঁর সম্পূর্ণ অজানা। 

মামলার বাদী ও আসামির এই দূরত্বের ব্যবধান এবং নানা অসংগতির কারণে গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


​রহস্যময় মামলা ও পুলিশের প্রতিবেদন:-

​পুলিশের আদালতগামী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তানোর থানায় (মামলা নম্বর: ০১, জিআর: ২২১/২৪) দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়। এজাহারে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ওই বছরের ৪ আগস্ট।


​পুলিশের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন তানোর পৌরসভার আমশো মেডিকেল মোড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং পরবর্তীতে গোল্লাপাড়া বাজার এলাকার দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। এই মামলায় নিবিড় তদন্ত শেষে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলেছে দাবি করে তাঁকে জেলহাজতে আটক রাখার আবেদন জানায় পুলিশ।



​বাদীর অজ্ঞতা ও ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান:-

​মামলার সবচেয়ে নাটকীয় মোড় নিয়েছে খোদ বাদীর বক্তব্যে। গণমাধ্যমকে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই এবং তিনি ওই আসামিকে চেনেন না; বরং সাংবাদিকদের মুখ থেকেই তিনি প্রথম বিষয়টি শুনেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, বাদী যদি সিরাজুল ইসলামকে না-ই চেনেন, তবে তিনি কীভাবে মামলার আসামি হলেন? মূল এজাহারে তাঁর নাম ছিল কি না কিংবা তদন্তের কোন পর্যায়ে তাঁকে জড়ানো হয়েছে, তা নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে।


​এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী সিরাজুলের বাড়ি তানোরের জুমারপাড়া গ্রামে। আর পুলিশের উল্লেখ করা কথিত ঘটনাস্থল থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ঘটনার দিন তাঁর প্রকৃত অবস্থান, যাতায়াত কিংবা সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়টি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে দেখা দিয়েছে ঘোর সংশয়।


​রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ও আইনের সমতা নিয়ে প্রশ্ন:-

​পুলিশের প্রতিবেদনে সিরাজুল ইসলামকে ২ নম্বর বাধাইড় ইউনিয়ন প্রজন্মলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তাঁর পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে ছিলেন এবং সম্প্রতি ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। পুলিশ কী তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর এই রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


​অন্যদিকে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, যেখানে অতীতে ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা অনিয়মে জড়িত প্রভাবশালীরা বহাল তবিয়তে ঘুরছেন, সেখানে একজন প্রবাসীকে দুই বছর আগের মামলায় এভাবে গ্রেপ্তার করা আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কোনো মহলের রাজনৈতিক চাপে বা প্রভাবে এই গ্রেপ্তার কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।


​সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকের নিরাপত্তা শঙ্কা:-

​এই সংবেদনশীল ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রস্তুতির সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মী মমিনুল ইসলাম মুন। গোপন সূত্রে তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়ার তথ্য পাওয়ার পর তিনি নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, পুলিশ সুপার, তানোর থানার ওসি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি তানোর থেকে অন্যত্র বদলি বা দায়িত্ব পালনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষা ও গণমাধ্যমকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


​নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা:-

​সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহার, গ্রেপ্তারের নেপথ্য কারণ এবং পুলিশের প্রতিবেদনের চুলচেরা বিশ্লেষণ জরুরি। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন ব্যক্তিগত বিরোধ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

​অপরাধী যেই হোক তাঁর বিচার হোক, কিন্তু কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন—এটাই দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা। মামলার বাদী নিজেই যাঁকে চেনেন না, সেই প্রবাসীকে কোন জাদুমন্ত্রে আসামি করা হলো—এই যৌক্তিক ও মৌলিক প্রশ্নের স্বচ্ছ আইনি জবাব মিলবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।