রাজশাহীর সেই সরকারি কলেজের সম্পদে প্রভাব বিস্তরে শিক্ষিকার উপর চড়াও তাদের

They attacked the teacher.
রাজশাহী প্রতিনিধি: ০৪ মে ২০২৬ ০৬:১২ অপরাহ্ন সারা বাংলা
রাজশাহী প্রতিনিধি: ০৪ মে ২০২৬ ০৬:১২ অপরাহ্ন
রাজশাহীর সেই সরকারি কলেজের সম্পদে প্রভাব বিস্তরে শিক্ষিকার উপর চড়াও তাদের
রাজশাহীর সেই সরকারি কলেজের সম্পদে প্রভাব বিস্তরে শিক্ষিকার উপর চড়াও তাদের

 রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের তাণ্ডব এবং শিক্ষিকাকে জুতাপেটা ও মারধরের ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তোলপাড়। ঘটনার পর ১০ দিন পার হলেও এর নেপথ্যে কারা এবং কী কারণেইবা ওইদিন কলেজে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখনো চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।সংবাদ পরিবেশন

স্থানীয় সূত্র জানায়, কলেজটির নামে থাকা প্রায় ৮ বিঘা পুকুর ও কয়েকটি পানের বরজ ছাড়াও ভর্তি ফি, বিভিন্ন চাঁদা ও অন্যান্য খাত থেকে বছরে লাখ লাখ টাকার আয় হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব সম্পদ ও তহবিলের ওপর প্রভাব বিস্তার নিয়ে সক্রিয় একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এসব খাত থেকে অর্জিত অর্থের বড় অংশ নিয়মিতভাবে তছরুপ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে কলেজটি জাতীয়করণ হলেও রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। সর্বশেষ নতুন অধ্যক্ষ ড. আব্দুর রাজ্জাক দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী মহল।

গত ২৩ এপ্রিল কলেজের পুকুর ও পানের বরজ উন্মুক্তভাবে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ। এতে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাভোগী চক্রটির স্বার্থে আঘাত লাগে। এর জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।Politics

স্থানীয় বাসিন্দা এবং কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ ওরফে সামাদ দারোগার নেতৃত্বে বিএনপি নেতাকর্মীরা কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিতে ক্যাম্পাসে ঢোকে। যে দল যখন ক্ষমতায়, সামাদ দারোগা তখন সেই দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশে যান। পুকুর ও পানের বরজের লিজের টাকা কলেজ তহবিলে জমা করা হয় না। তাছাড়া যত টাকা লিজ হয়, পাকা রসিদে তার চেয়ে অনেক কম টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এনামুল হক ও সামাদ দারোগা চক্রটি সাবেক অধ্যক্ষ দুর্গাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হকসহ কলেজের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের ‘রক্ষা’ করার কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো শিক্ষকই মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।

সূত্র বলছে, কলেজের সম্পদ দীর্ঘ সময় ধরেই লুটপাট করা হচ্ছিল। আওয়ামী জমানায় তৎকালীন অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক দীর্ঘ ১৫ বছর এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হকের সময়ে কলেজের সম্পদ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়ে লুটপাট করা হয়।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক ছিলেন রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক এমপি ওয়াদুদ দারার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি ২০১০ সালের ২১ মার্চ থেকে অধ্যক্ষের পদে ছিলেন। মোজাম্মেল শেখ হাসিনার পতনের পরও সামাদ দারোগা এবং পরবর্তী সময়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করা এনামুল হকের ছত্রছায়ায় বহাল থেকে যান। গত বছর ১৫ এপ্রিল মোজাম্মেল অবসরে যান। পরে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রায়হান মজিদকে ডিঙিয়ে এনামুল হককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মাত্র আট মাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এনামুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, কলেজের পুকুর এবং পানের বরজ চার ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া রয়েছে। লিজ গ্রহণকারী শহিদুলের ভাই জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রতিবছর ৭০ হাজার টাকা চুক্তিতে লিজ নিয়েছি। কিন্তু রসিদ দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকার। বাকি দুই জন লিজগ্রহীতাও একই অভিযোগ করেছেন।

কলেজের পিওন আনায়েম হোসেনের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ। ২৩ এপ্রিল ঘটনার সময় কলেজ শিক্ষিকা আলেয়া খাতুন হিরাকে বেশ কয়েকবার শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে উদ্যত হন আনায়েম। এ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আনায়েম স্থানীয় হওয়ায় তার দাপটে অস্থির থাকেন কলেজ অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা।

গত ১৭ ডিসেম্বর নতুন অধ্যক্ষ ড. আব্দুর রাজ্জাক দায়িত্ব নেওয়ার পর পালটে যায় দৃশ্যপট। নতুন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি করে আসছিল। তিনি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটে কলেজের পুকুর লিজের টাকা এবং বিভিন্ন তহবিল তছরুপের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

এদিকে, নতুন অধ্যক্ষ ২৩ এপ্রিল পুকুর ও পানের বরজ উন্মুক্তভাবে লিজ দেওয়ার ঘোষণা দেন। শিক্ষক ও কর্মচারীদের সমন্বয়ে কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি প্রকাশ্যে লিজে অংশ নেওয়ার জন্য এলাকায় মাইকিং করে। ডিগ্রি পরীক্ষা থাকার কারণে সন্ধ্যা ৬টায় লিজ কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়।

এতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সামাদ ও এনামুলের নেতৃত্বাধীন চক্রটি মব সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করে। ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টায় দারোগা সামাদের নেতৃত্বে জয়নাল, মন্টু, আফাজ, এজদার, তোফাজসহ বিএনপির ১২ থেকে ১৫ নেতাকর্মীর একটি দল জোরপূর্বক অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। অধ্যক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করছিলেন। তাদের পাশের একটি কক্ষে বসার অনুরোধ করা হয়। এ সময় শিক্ষিকা হিরা বের হয়ে এলে দারোগা সামাদ অধ্যক্ষকে ডাকতে বলেন। হিরা এ সময় মিটিং চলছে জানালে সামাদ দারোগাসহ তার সহযোগীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।

দুলাল, এজদার, জয়নালসহ কয়েকজন হিরাকে ধাক্কা মারেন। একপর্যায়ে সামাদ ও তার সহযোগীরা জোরপূর্বক ঢুকে পড়েন। অধ্যক্ষকে গালাগাল শুরু করেন। শিক্ষক হিরা ঘটনার ভিডিও ধারণ শুরু করেন। বিএনপিকর্মী শাহাদ এ সময় হিরাকে তার পায়ের স্যান্ডেল খুলে মারেন এবং চড়থাপ্পড় দেন। হিরাও এ সময় শাহাদকে থাপ্পড় দেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা হিরার ফোন কেড়ে নেন। এ পর্যায়ে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি হলে সামাদ দারোগা এবং এনামুল ফোন করে বাইরে থেকে আরও লোকজন ডাকেন।

দ্বিতীয় দফায় শুরু হয় আবার উত্তেজনা। হিরাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে মারধর করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এরপর বিএনপির আরও নেতাকর্মী লোহার রড আর হাতুড়ি নিয়ে বাইরে থেকে এসে যোগ দেন। তৃতীয় দফায় অধ্যক্ষ রাজ্জাককে কিলঘুসি মারেন। তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। তার মাথা, হাত এবং কপালে আঘাতে লাগে। অধ্যক্ষের মোবাইল ফোনে প্রকাশ্যে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অধ্যক্ষ রাজ্জাক, হিরাসহ পাঁচজন শিক্ষক ও কর্মচারীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীকে চড় মারার অপরাধে আলেয়া খাতুন হিরাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক বলেন, ‘আমার সঙ্গে দারোগা সামাদ বা বিএনপি নেতাকর্মীদের কোনো ব্যাপারে সম্পৃক্ততা নেই। আমার সময়ে কলেজের সম্পদ লিজে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। বেশি টাকা নিয়ে রসিদে কম টাকা উল্লেখের বিষয়টি সঠিক না। ব্যাংকে টাকা জমা না দেওয়া হলেও রেজুলেশন করে কলেজের বিভিন্ন খাতে লিজের টাকা ব্যয় করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সাবেক অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হক এবং আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। সাবেক অধ্যক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এলাকার মানুষের চাপ ছিল। তবে আমরা কাউকে সরাতে পারি না, আবার রাখতেও পারি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাবেক অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক এবং আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা কলেজে আসতে শুরু করেন।’

অভিযোগ অস্বীকার করে একই ধরনের কথা বলেছেন আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকি। আমি সেদিন অধ্যক্ষকে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের দাওয়াত দেওয়ার জন্য কলেজে যাই। আমার নেতৃত্বে কোনো হামলা হয়নি। কারা সেখানে গেছেন, সেটি বলতে পারব না। উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষিকা হিরা বিএনপি নেতাকর্মীদের চড়থাপ্পড় মারছিলেন। আমি থামানোর চেষ্টা করেছি। আর সাবেক অধ্যক্ষ মোজাম্মেল এবং আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের কাছে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শাহাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। স্থানীয় একটি হিমাগার থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগে শাহাদের বিরুদ্ধে হিমাগার কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা করে। সেই মামলায় তার বিরুদ্ধে অনেক আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই নানাভাবে বিভিন্ন গ্রুপ চাঁদা দাবি করছে। এছাড়া কলেজের বিভিন্ন তহবিল ও সম্পদ স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনার চেষ্টা করায় একটি মহল আমার ওপর ক্ষুব্ধ। এ কারণেই হয়তো আমিসহ শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমি এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানায় জিডি করেছি।