হাম আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছেন বাবা
রুমা বেগম ও ইসমাইলের একমাত্র সন্তান চার বছরের রুমান। এক সপ্তাহ আগে জ্বর ও পাতলা পায়খানা শুরু হলে গত ১ মে রাজধানীর মহাখালী কলেরা হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করান তারা। তবে এখনো জ্বর ও ডায়রিয়ার কোনো উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে গত পরশু শরীরে হামের র্যাশ ওঠার পরই গতকাল কলেরা হাসপাতাল থেকে রুমানকে ছাড়পত্র দিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।
পরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গেলে সেখানে জানানো হয়, এক বছরের বেশি বয়সি হামের রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। সেখান থেকে তাদের ডিএনসিসি হাসপাতালে যেতে বলা হয়। পরে ডিএনসিসি হাসপাতালে গেলে সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, সিট না থাকায় ভর্তি রাখা সম্ভব নয়। তারা শিশু হাসপাতাল কিংবা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। পরে রুমানকে নিয়ে শিশু হাসপাতালে গেলে সেখানেও সিট খালি না থাকায় ভর্তি করানো যায়নি। পরে বাসায় ফিরে যান তারা। এরপর আজ সকালে ঢাকা মেডিকেলে এলে দুপুর ১২টার দিকে ৮ নম্বর রুমে চিকিৎসক দেখানোর পর রুমানকে ভর্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুপুর ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ওয়ার্ডের সামনে বসে থাকলেও এখনো ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
ছেলেকে কোলে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা মা রুমা বেগমের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, গতকাল থেকে চারটি হাসপাতালে গিয়েও রুমানকে ভর্তি করাতে পারিনি। কলেরা হাসপাতালে চার দিন ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি ছিলেন তারা। এর মধ্যে পরশু তার শরীরে হামের র্যাশ ওঠে। এরপর আমাদের সেখান থেকে ছাড়পত্র দিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, এক বছরের বেশি বয়সি শিশুদের ভর্তি নেওয়া হয় না।
পরে তারা আমাদের ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে গেলে বলা হয়, সিট নেই, তাই ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছিলাম অন্তত ওষুধ লিখে দিতে, যেন বাসায় নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু কোনো ওষুধ না দিয়ে শিশু হাসপাতাল বা কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেতে বলা হয়। পরে শিশু হাসপাতালে গেলেও সেখানেও সিট না থাকায় ভর্তি নেয়নি। শেষ পর্যন্ত বাসায় ফিরে যাই।
রুমানের মা আরও বলেন, গতকাল রাত থেকে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্টও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পাতলা পায়খানাও চলছে। আজ সকাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ বার পাতলা পায়খানা করেছে। তাই আর কোথাও না গিয়ে সরাসরি ঢাকা মেডিকেলেই এসেছি। কিন্তু ৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বসে থাকলেও এখনো কোনো সিট দেওয়া হয়নি। কোথায় নেওয়া হবে তাও বলা হয়নি। এদিকে সময় যত যাচ্ছে, ছেলেটি ততই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রুমানের বাবা ইসমাইল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে চারটি হাসপাতালে গেলাম, কোথাও ভর্তি নিল না। আমরা গরিব বলে কি চিকিৎসা পাব না? এখানে (ঢাকা মেডিকেল) দুপুর থেকে বসে আছি, এখনো ভর্তি নেয়নি। ৫ ঘণ্টা আগে চিকিৎসক ভর্তি দিলেও এখনো কোনো চিকিৎসা শুরু হয়নি। কিছুক্ষণ আগে কাগজপত্র নেওয়া হয়েছে। সকাল থেকে টানা ডায়রিয়ার কারণে সে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। না খেতে পারছে, না স্যালাইন পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমি নিজেও অসুস্থ। ফুটপাতে চা বিক্রি করি। আজ গরিব বলে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। যদি আমাদের টাকা-পয়সা থাকতো তাহলে হয়ত কোথাও ছেলের ভালো চিকিৎসা করাতে পারতাম। কিন্তু আল্লাহ সেটা আমাদের কপালে রাখেনি।
ভর্তিতে দেড়ি হওয়ার বিষয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, হাসপাতালে আসার পর রোগীকে এক্স-রে করতে দেওয়া হয়েছে। সদ্য রিপোর্ট এসেছে। হামের কারণে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখা হয়নি। পুরো কেস স্টাডি লিখতে কিছুটা সময় লাগায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।
এদিকে গত ২১ এপ্রিল হামের রোগীর চাপ সামাল দিতে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শয্যা সংকট দেখিয়ে কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হামের উপসর্গের রোগীকে অন্যত্র ফেরত পাঠানো যাবে না বলেও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলেও রোগী ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না; প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে কেবল জটিল ও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীকে রেফার করা যাবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, রেফারের ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের নির্ধারিত রেফারাল চেইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এ নিয়ম লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রধানকে দায় নিতে হবে।