আজ বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস : দেশে আক্রান্ত রোগী ৭০ হাজারের বেশি
দেশে বংশগত রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়া রোগী দিনদিন বাড়ছে। ৮ বছরে বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। প্রতিবছর ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বর্তমানে দেশে ৭০ হাজারের বেশি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো আজ দেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস-২০২৬’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য-‘আর নয় আড়ালে : শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল বংশগত রক্তরোগ; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানবকোষে রক্ত তৈরি করার জন্য দুটি জিন থাকে। কোনো ব্যক্তির রক্ত তৈরির একটি জিনে ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়া বাহক বলে। আর দুটি জিনেই ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়া রোগী বলে। তবে সব বাহকই রোগী না। শিশু জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের লক্ষণগুলো হলো-ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘনঘন রোগ সংক্রমণ, শিশুর ওজন না বাড়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ প্রভৃতি।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মমতাজ জাহান কলি বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের নিবন্ধিত রোগী ছিল ২ হাজার ৭২৫ জন। ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৯৮ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৪১৬ জন, ২০২১ সালে ৪ হাজার ৯৪১ জন, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৫৫ জন, ২০২৩ সালে ছিল ৭ হাজার ২২ জন এবং ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৫১১ জন। ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ৮ হাজার ৯৪৬ জন রোগী পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। যাদের চিকিৎসায় বছরে ৩৬ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় মাত্র ১৮ শতাংশের জোগান দেওয়া সম্ভব হয়। একজন রোগীর চিকিৎসা বাবদ মাসে কমপক্ষে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়।
বিশ্বের ১.৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া বহন করছে। অর্থাৎ ৮ থেকে ৯ কোটি মানুষ এই রোগের বাহক। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব ৩ থেকে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যা মোট জনসংখ্যার ১১.৪ শতাংশ। ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশে ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ এ রোগের বাহক ছিল। গ্রামাঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১.৬ এবং শহরে ১১.০ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রংপুরে ২৭.৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাজশাহীতে ১১.৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা চট্টগ্রামে ১১.২ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহে ৯.৮, খুলনায় ৮.৬, ঢাকায় ৮.৬, বরিশালে ৭.৩ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৪.৮ শতাংশ। ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে এই বাহক রয়েছে ১১.৯ শতাংশ, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের ১২ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ১০.৩ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের মধ্যে ১১.৩ শতাংশ। ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক আরেকজন বাহককে বিয়ে করলেই শিশু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের শনাক্তকরণের পদ্ধতিটাই এখন ভুলভাবে হচ্ছে। রোগটি নির্ণয়ের টেস্ট যদি এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার সময় বাধ্যতামূলক বা উৎসাহ দিয়ে করা যায়, অথবা প্রসূতি নারীদের এন্টিনেটাল কেয়ারের (এএনসি) সময় মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, সেটা জানা যাবে।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। সবকিছু হচ্ছে অটোলোগাস, অর্থাৎ আক্রান্ত নিজেরই বোনম্যারো দিয়ে নিজেরটা সারানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ট্রান্সপ্লান্টের মূল সাফল্য হলো এলোজেনিক ট্রান্সপ্লান্ট, সেটা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে করতে পারিনি। এই ধরনের রোগীর আসলে বেঁচে থাকার সুযোগ কম। একই সঙ্গে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু সরকারি হাসপাতালে ডে-কেয়ার ভিত্তিতে ট্রান্সমিশন নিতে পারে। সেবা দেওয়া হয় দিনে। ফলে এসব শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি ডে-কেয়ারে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা ট্রান্সফিউশন সেবা রাখা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধযোগ্য। বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করে সাইপ্রাস, ইতালি ও গ্রিসের মতো দেশ থ্যালাসেমিয়া রোগী প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেলে থ্যালাসেমিয়া রোগী সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে। এই রোগের চিকিৎসায় সরকারকে ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এদিকে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন মালিবাগ কার্যালয়ে সচেতনতামূলক র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি, মেডিকেলের হেমাটোলজি বিভাগসহ বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করবে।