বিশ্বকাপ আমেরিকায়, উত্তাপ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে

Football World Cup
আবুল কালাম আজাদ:- ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ:- ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ন
বিশ্বকাপ আমেরিকায়, উত্তাপ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
--সংগৃহীত ছবি

চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ, এটি শুধু একটি খেলা হয়েই আসে না এটি পরিণত হয় বৈশ্বিক এক সাংস্কৃতিক উৎসবে। এবারের বিশ্বকাপের আসর বসেছে যুক্তরাষ্ট্রে। আধুনিক স্টেডিয়াম, উন্নত প্রযুক্তি ও কোটি কোটি দর্শকের উপস্থিতিতে বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু এই আয়োজনের প্রকৃত বিস্তার কেবল আয়োজক দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশেও বিশ্বকাপের উত্তাপ সমানভাবে অনুভূত হচ্ছে। দেশের প্রতিটি শহর, মফস্বল, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও বিশ্বকাপ যেন এক অনানুষ্ঠানিক জাতীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে।

বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশকে নতুন করে আবিষ্কার করে বিশ্ব। বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় নিজস্ব কোন দল না থাকলেও  ফুটবলের প্রতি এমন আবেগ, এমন উন্মাদনা সত্যিই বিরল। অলিগলি থেকে মহাসড়ক, ছাদ থেকে বাজার-সবখানে উড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের পতাকা।

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের সমর্থনে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। রাতভর খেলা দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা, চায়ের দোকানে তর্ক-বিতর্ক সব মিলিয়ে ফুটবল কয়েক সপ্তাহের জন্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

এ আবেগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। খেলাধুলা মানুষকে আনন্দ দেয়, ভিন্ন মতের মানুষকে একত্র করে এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। বিশ্বকাপ সেই সুযোগটিকেই আরও বড় পরিসরে এনে দেয়। তবে একই সঙ্গে কিছু বাস্তব প্রশ্নও সামনে আসে। যে দেশ ফুটবলকে এত ভালোবাসে, সেই দেশের জাতীয় দল কেন এখনও বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ করতে পারছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ, নিয়মিত বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, দক্ষ কোচ তৈরি এবং পেশাদার লিগ পরিচালনায় এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। সম্ভাবনাময় বহু ফুটবলার পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। মাঠ কমছে, অনুশীলনের পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যতটা বেড়েছে, জাতীয় দলের সাফল্য ততটা এগোয়নি।

অন্যদিকে বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। জার্সি, ফুটবল, পতাকা, টেলিভিশন, প্রজেক্টর ও বিভিন্ন ক্রীড়াসামগ্রীর বিক্রি বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বড় ব্যবসায়ী অনেকেই এই সময় অতিরিক্ত আয় করেন। স্থানীয় পর্যায়ে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানে দর্শকের ভিড়ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনে। অর্থাৎ বিশ্বকাপ কেবল আবেগ নয়, অর্থনীতিরও একটি মৌসুমি চালিকাশক্তি।

তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য কিংবা ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনাও মাঝে মাঝে দেখা যায়। খেলাধুলা আনন্দের একটি অংশ সেটিকে সংঘাতের কারণ বানানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। খেলার সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে শেখায়, ঘৃণা ছড়াতে নয়।

বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম বিশ্ববাসীর কাছে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রশংসার চেয়ে বড় প্রয়োজন এই ভালোবাসাকে বাস্তব শক্তিতে রূপ দেওয়া। ফুটবলের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং প্রতিভা বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আজ যারা অন্য দেশের পতাকা হাতে বিশ্বকাপ উপভোগ করছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন একদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা নিয়েই বিশ্বকাপের গ্যালারিতে দাঁড়াতে পারে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলের।

বিশ্বকাপের উত্তাপ একদিন শেষ হবে। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে, বিজয়ীর হাতে উঠবে ট্রফি। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম থেমে থাকবে না। সেই ভালোবাসাকে যদি পরিকল্পিত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে হয়তো কোনো এক বিশ্বকাপে দর্শক হিসেবে নয়, প্রতিযোগী হিসেবেই বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে। সেই প্রত্যাশাই হোক এবারের বিশ্বকাপ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।