জিরাফের থেকে ১০ গুণ লম্বা গলার ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত তাইল্যান্ডে!
বিশাল বড় গলা। জিরাফের থেকে প্রায় ১০ গুণ। আজ থেকে প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত বিশালদেহী এই ডাইনোসরেরা। অথচ এত দিন পর্যন্ত এদের বিষয়ে মানুষ কিছুই জানত না।
সত্যজিৎ রায়ের ‘টেরোডাকটিলের ডিম’ হোক, বা স্টিফেন স্পিলবার্গের ‘জুরাসিক পার্ক’— ডাইনোসরদের নিয়ে মানুষের কৌতূহলে বরাবর রসদ জুগিয়ে গিয়েছে এই কল্পকাহিনীগুলি। লম্বা গলার আপাত শান্ত বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসরের সঙ্গেও পরিচয় করিয়েছে ‘জুরাসিক পার্ক’। দেখা গিয়েছে মামেনচিসরাসদেরও, যাদের গলা বাকিদের তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় লম্বা।
সদ্য আবিষ্কৃত এই ডাইনোসর প্রজাতিটিও সেই মামেনচিসরাস গোত্রের। উত্তর-পূর্ব তাইল্যান্ডের কালাসিন প্রদেশে এই প্রথম তাদের কোনও জীবাশ্মের সন্ধান মিলেছে। বিজ্ঞানীরা এই নতুন প্রজাতির নাম রেখেছেন উরাগাসোরাস ক্যালাসিনেনসিস। পৃথিবীতে ঠিক কোন সময়ে এদের আবির্ভাব হয় তা স্পষ্ট নয়। তবে জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে গবেষকদের অনুমান, তৃণভোজী এই ডাইনোসরেরা আজ থেকে প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত।
বর্তমানে যে সব জিরাফ দেখা যায়, তাদের গলা গড়ে ৫-৬ ফুট লম্বা হয়। সেই তুলনায় উরাগাসোরাসের গলা হত প্রায় ৬৬ ফুট লম্বা। অনুমান করা হয়, উঁচু গাছপালা থেকে খাবার খাওয়ার জন্যই এদের গলা এমন অস্বাভাবিক লম্বা হত।
জুরাসিক যুগে (২০ কোটি ১৩ লক্ষ বছর আগে শুরু হয়ে ১৪ কোটি ৫৫ লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত চলা সময়কাল) বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত। তাদের মধ্যে কেউ ছিল শিকারি, কেউ ছিল শিকার। থেরোপড গোত্রের ডাইনোসরেরা ছিল হিংস্র শিকারি, যাদের মধ্যে অন্যতম টির্যাইনোসরাস-রেক্স বা টি-রেক্স। ছিল তৃণভোজী সরোপডেরাও। এরা ছিল শান্ত প্রকৃতির। লম্বা গলার এই মামেনচিসরাস গোত্রের সব ডাইনোসরই ছিল সরোপড। এ পর্যন্ত মামেনচিসরাস গোত্রের যত জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়েছে, তার বেশির ভাগই মিলেছে চিন এবং তাইল্যান্ডে। তবে উরাগাসোরাসের জীবাশ্ম মিলল এই প্রথম। চলতি সপ্তাহে ‘নেচার’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন তাইল্যান্ডের মাহাসারাখাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাপিরুট নিলপানাপান। ডাইনোসরের মাত্র একটি কশেরুকার জীবাশ্ম থেকে এই নতুন প্রজাতিকে শনাক্ত করেন নিলপানাপান এবং তাঁর সহযোগীরা। বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জীবাশ্মের নিদর্শন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। কোথাও একটি দাঁত, কোথাও একটি হাড়ের টুকরো… তার পরে সেগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশদ চিত্র উঠে আসে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি মাত্র কশেরুকা থেকে এই প্রজাতির সন্ধান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
নিলপানাপান এবং তাঁর সহযোগীরা তাইল্যান্ডের যে অঞ্চল থেকে এই জীবাশ্মটি আবিষ্কার করেছেন, সেখানে অতীতেও বিভিন্ন ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। প্রথম মিলেছিল ২০০৮ সালে। সাম্প্রতিক গবেষণার সময়েও বিভিন্ন জীবাশ্মের টুকরো পাওয়া যায়। পাওয়া যায় বিভিন্ন ডাইনোসরের দাঁত এবং হাড়ের জীবাশ্ম। তবে যে কশেরুকা থেকে এই প্রজাতিটি আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটি ছিল ডাইনোসরটির পিঠের মাঝের অংশ বা উপরের দিকের অংশের। নমুনাটির সিটি স্ক্যান করে গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে সেটি মামেনচিসরাস গোত্রের একটি সরোপড। যাদের গলা ছিল অস্বাভাবিক মাত্রায় লম্বা।
তবে এটির সবচেয়ে লম্বা গলার ডাইনোসর নয়। অতীতে এর চেয়েও লম্বা গলার সরোপডের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। গত মে মাসেই তাইল্যান্ডে খননকার্যের সময়ে ভিন্ন এক ধরনের তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। নাগাটাইটান নামে ওই ডাইনোসর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ যাবৎকালে পাওয়া সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের উদাহরণ। তাদের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮৮ ফুট। ওজন হত প্রায় ২৭ টন, যা প্রায় ৯টি পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজনের সমান।
___আনন্দবাজার পত্রিকা