হাদিস শাস্ত্রে অবদান রেখেছেন যে মুসলিম নারী

Muslim women who contributed to the Hadith literature
অনলাইন ডেস্ক ২২ জুলাই ২০২৬ ০৪:১৮ অপরাহ্ন ধর্ম
অনলাইন ডেস্ক ২২ জুলাই ২০২৬ ০৪:১৮ অপরাহ্ন
হাদিস শাস্ত্রে অবদান রেখেছেন যে মুসলিম নারী
--সংগৃহীত ছবি

একাদশ শতকের মুসলিম বিশ্বে হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কারিমা আল মারওয়াজিয়্যা। অসাধারণ জ্ঞান, দক্ষতা এবং অনন্য যোগ্যতার বলে তিনি হাদিস গবেষণায় তৎকালীন সময়ের শীর্ষ স্থানীয়দের মর্যাদা লাভ করেন।

শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ কারিমা আল মারওয়াজিয়্যা

উম্মুল কিরাম কারিমা বিনতে আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন হাতিম আল মারওয়াজিয়্যা (৯৬৯ থেকে ১০৬৯ খ্রিস্টাব্দ) একাদশ শতকের এক প্রখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি পরবর্তীতে তার সময়ের অন্যতম সেরা বিজ্ঞ মুসলিম নারী এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের একজন হয়ে ওঠেন। আল মুনতাজিম গ্রন্থসহ অন্যান্য কিছু সূত্রে তাকে ইবনে আবি হাতিম নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।

হাদিস শাস্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংকলন সহিহ বুখারির বিশ্বস্ত রাবি বা বর্ণনাকারী হিসেবে কারিমা বিশেষ পরিচিতি পান। হাদিস বলতে মহানবী (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও মৌন সম্মতিকে বোঝায়। একটি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা বা নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে এর সনদ বা বর্ণনাধারার ওপর।

আধুনিক যুগের মতো অতীতে হাদিসের বইপত্র এতো সহজে পাওয়া যেত না, কারণ তখনো মুদ্রণযন্ত্রের বিকাশ ঘটেনি। সে সময় হাদিসের বড় বড় সংকলন প্রস্তুত করার কাজ চলছিল। এই প্রেক্ষাপটে কারিমা তার অর্জিত জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

নিজের বিশেষ দক্ষতার কারণে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সহিহ বুখারি বর্ণনা করতে পারতেন। এই গুণ তাকে তৎকালীন জ্ঞানের জগতে এক বিশেষ মর্যাদায় আসীন করে। তিনি নিখুঁতভাবে ও সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সহিহ বুখারি উপস্থাপন করতেন, যার ফলে তার খ্যাতি তৎকালীন পুরুষ আলেমদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

জন্ম ও বেড়ে উঠা

হাদিস গবেষণায় কারিমা এমন এক অসাধারণ মেধা ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যা সেই যুগের সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার বিকাশে বড় প্রভাব ফেলেছিল। তিনি মুসনিদাহ উপাধিতে ভূষিত হন। এর অর্থ হলো, শুধু হাদিস বর্ণনাই নয়, তিনি ছিলেন হাদিসের মান ও সনদ মূল্যায়নের একজন যোগ্য বিচারক।

মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক মার্ভ শহরের কাছে কুশমাইহান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মার্ভ শহরটি পরবর্তীতে ফারসি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ওপর ভর করে ইসলামী শিক্ষা ও চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই মনোরম ও সমৃদ্ধ শহরে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে জ্ঞান পিপাসুরা সমবেত হতেন। খ্রিস্টান বিশ্ব ও মধ্য এশিয়ার দূরদূরান্তের বিজ্ঞজনেরা এর সুবিশাল লাইব্রেরি ব্যবহার করতে এবং তৎকালীন সময়ের উচ্চমানের একাডেমিক আলোচনায় অংশ নিতে সেখানে আসতেন।

কারিমার সময়ে হাদিস সংকলন, আইন প্রণয়ন, ধর্মীয় দর্শন তৈরির বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে স্বীকৃত লাভ করে। তিনি হাদিস চর্চায় সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং বিশেষ করে সহিহ বুখারি সংকলনে তার দখল ছিল অনন্য। তিনি আবু আবদুল্লাহ আল ফিরাবরির কাছ থেকে এটি আয়ত্ত করেন, যিনি সরাসরি ইমাম বুখারি (রহ.) থেকে এই হাদিস সংকলনটি গ্রহণ করেছিলেন।

জ্ঞান অর্জনে কারিমার নিষ্ঠাপূর্ণ সফর

চব্বিশ বছর বয়সে কারিমা আল কুশমাইহানির (মৃত্যু ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ) কাছ থেকে সহিহ বুখারির সনদ গ্রহণ করেন। সনদপ্রাপ্ত একজন নতুন মুহাদ্দিস হিসেবে তিনি এ বিষয়ে অনন্য দক্ষতা অর্জন করেন।

শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করার আগে তিনি তার বাবা আহমদের সঙ্গে পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেকালের হজ ভ্রমণ বর্তমান সময়ের মতো ৯ ঘণ্টার বিমান সফরের মতো সহজ ছিল না। তখন এই সফরের জন্য কয়েক মাস, এমনকি কখনো কয়েক বছর লেগে যেত। সে যুগের জ্ঞান পিপাসুরা এই দীর্ঘ সফরকে শুধু হজ পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন না, বরং পথিমধ্যে বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত জ্ঞানীদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতেন।

পারস্যের (বর্তমান ইরান) মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কারিমা ও তার বাবা সারাখস ও ইসফাহান শহর সফর করেন, এই শহরটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরির জন্য বিখ্যাত ছিল। এরপর তারা ফিলিস্তিনের আল কুদস (বর্তমান জেরুজালেমের পুরোনো শহর) ভ্রমণ করেন। তাদের এই সফর শেষ হয় পবিত্র মক্কা নগরীতে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা শেষে এবং হৃদয়ে সহিহ বুখারি ধারণ করে যখন কারিমা মক্কায় পৌঁছান, তখন তার আনন্দ ছিল দেখার মতো। মহানবী (সা.) যে মাটিতে বেড়ে উঠেছেন এবং যেখানে ওহী লাভের পর জীবনের প্রথম ১৩ বছর কাটিয়েছেন, সেই ভূমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা তার জন্য ছিল এক অবিস্মরণীয় অনুভূতি।

এক নিষ্ঠাবান মুহাদ্দিসা

হাদিস শাস্ত্রে বিশেষ দক্ষতার কারণে করিমার কাছে শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করেন। তবে শিক্ষক হিসেবে তার সহজাত ক্ষমতাই তার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। তার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনার অনুমতি পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হতো। তার বর্ণিত হাদিসগুলো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সহিহ হিসেবে বিবেচিত হতো, কারণ তিনি সনদের সততা রক্ষা ও এর শুদ্ধতা বজায় রাখতে কঠোর নিয়ম মেনে চলতেন।

জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি তার তাকওয়া, দয়ার জন্যও সুপরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেকে সারাজীবন একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে নিয়োজিত রেখেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারিমার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং দূরদূরান্ত থেকে ছাত্র ও জ্ঞানপিপাসুরা তার কাছে ছুটে আসতেন।

হাদিস শাস্ত্রে নারীদের অবদান

১০০ বছর দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন কারিমা। তবে তরুণ বয়সে শুরু করা জ্ঞানসাধনার সফর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। 

জীবদ্দশায় করিমার হাদিস বর্ণনাকে তৎকালীন অনেক পুরুষ মুহাদ্দিসের বর্ণনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব ও প্রাধান্য দেওয়া হতো। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের নারী মুহাদ্দিসদের জন্য পথ সুগম করে যান, যারা ঐশী জ্ঞান ছড়ানোর ক্ষেত্রে পুরুষদের সমকক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

আজকাল মুসলিম মনীষীদের কথা বলতে গেলে শুধু পুরুষদের নামই বেশি শোনা যায়। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে যে মহান নারী মনীষীরা ছিলেন, তাদের কথা অনেকেই জানেন না। বিশাল পাঠ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মুখস্থ রাখা ও তা নির্ভুলভাবে প্রচার করার ক্ষেত্রে কারিমার মতো জ্ঞানী নারীদের অবদান ছিল অপরিসীম। অনেক সময় পুরুষ বর্ণনাকারীদের স্মৃতিশক্তি বা নৈতিক সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নারী বর্ণনাকারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের দুর্বলতা বা সমালোচনার উদাহরণ একেবারেই বিরল।

করিমা বিনতে আহমদের জীবন থেকে শিক্ষা

ইসলামী জ্ঞানচর্চায় কারিমার অবদান মূলত সনদ ব্যবস্থার গুরুত্বকে তুলে ধরে, যার মাধ্যমে মুহাদ্দিসেরা তথ্য প্রদানকারীর নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করতে পারেন। নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে মুহাদ্দিসেরা যেকোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ করেন। সনদ হলো মূল পাঠকে সঠিকভাবে সংরক্ষণের একটি মূল মাধ্যম, আর এই বিশ্বস্ত সনদের ওপর ভিত্তি করেই মুসলিমরা শরিয়তের বিধানাবলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন।