কোরআনে বর্ণিত ৬ নারীর জীবনীতে যে শিক্ষা রয়েছে
পবিত্র কোরআন নৈতিক দিকনির্দেশনার একটি সার্বজনীন গ্রন্থ। পাশাপাশি এতে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। কোরআনে যেসব নারীর কথা এসেছে, তাদের শুধু ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং তাদের জীবন ও কর্মের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য বিভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ আদর্শ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন, আবার কারও কর্মকাণ্ডের নিন্দা করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আনুমানিক ২৪ জন নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তার কিতাবে এমন কিছু পুণ্যবতী নারীর কথা বলেছেন, যারা নিজেদের জীবন আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং পরিপূর্ণভাবে তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ফলে সব যুগের মানুষ তাদের আদর্শ ও চরিত্র থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
অন্যদিকে আল্লাহ এমন কিছু নারীর কথাও উল্লেখ করেছেন, যারা তার অবাধ্য হয়েছিল, ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং নিজেদের কাজের পরিণতি ভোগ করেছিল। এর মাধ্যমে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে।
কোরআনে বর্ণিত ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র ও তাদের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো তুলে ধরা হলো।
হাওয়া (আ.)
কোরআনে আদি মাতা হাওয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে তাকে আদম (আ.)-এর স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাকে প্রথম নারী হিসেবে সৃষ্টি করেন এবং প্রথম পুরুষ আদম (আ.)-এর সঙ্গে তাকে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেন।
শয়তানের প্ররোচনায় তারা উভয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেন। এরপর তাদের জান্নাত থেকে বের করে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। নিজেদের ভুলের জন্য তারা আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কোরআনে তাদের সেই দোয়া এভাবে এসেছে—
হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। (সুরা আল-আরাফ, আয়াত : ২৩)
আদি মাতা হাওয়ার (আ.) জীবন সবদিক থেকে মানুষের সমতার বিষয়টি তুলে ধরে। তার চরিত্র একই সঙ্গে তওবার গুরুত্বও বোঝায়। কেউ পাপে জড়িয়ে পড়ার পর মনে করতে পারে, তার আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু হাওয়ার (আ.) ঘটনা তাকে আশার পথ দেখায়। যারা বারবার তওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাদের জন্য সবসময়ই আশার দরজা খোলা। কারণ আল্লাহ অবশ্যই তাদের আহ্বানে সাড়া দেন।
মরিয়ম (আ.)
পবিত্র কোরআনে একমাত্র এই নারীকে তার নাম ধরে উল্লেখ করা হয়েছে। মরিয়ম (আ.) পবিত্রতা, সতীত্ব ও নেকির প্রতীক। ইসলামে তার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। পবিত্র কোরআনে তার নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরাও রয়েছে, যা তার জন্য এক অনন্য সম্মান।
ফেরেশতারা বলেছিল, হে মরিয়ম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন এবং পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্বজগতের নারীদের ওপর মনোনীত করেছেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৪২)
শৈশব থেকেই মরিয়ম (আ.) আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এক ফেরেশতা তার কাছে এসে তাকে সুসংবাদ দেন যে, তিনি একজন সন্তানের মা হবেন। অথচ কোনো পুরুষ তাকে স্পর্শ করেনি।
নবী ঈসা (আ.)-কে জন্ম দেন তিনি। ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর কাছে তুলে নেওয়ার কয়েক বছর পর মরিয়ম (আ.) ইন্তেকাল করেন। সতীত্ব ও পবিত্রতার কারণে ইসলামে তিনি সব নারীর মধ্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেন। তিনি সবসময় দৃঢ় ছিলেন এবং আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস ছিল অটুট।
মুসা (আ.)-এর মা
ফেরাউন রামসেসের ভয়াবহ শাসনামলে মুসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় ফেরাউন বনি ইসরাইলের সব নবজাতক ছেলেশিশুকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল।
এ অবস্থায় আল্লাহ মুসা (আ.)-এর মাকে ওহির মাধ্যমে নির্দেশ দেন। তিনি তাকে আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখতে বলেন এবং শিশুপুত্র মুসাকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে নির্দেশ দেন, যাতে তিনি বেঁচে যেতে পারেন।
বর্ণিত হয়েছে, তাকে দুধ পান করাও। যখন তুমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করবে। তুমি ভয় পেয়ো না এবং দুঃখ করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের একজন করব। (সুরা আল-কাসাস, আয়াত ৭)
তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন এবং মুসা (আ.) বেঁচে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি আল্লাহর একজন রাসুল হন। আল্লাহর প্রতি তার অটুট বিশ্বাস এবং নিজের মাতৃত্বের স্বাভাবিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর নির্দেশ পালন করার কারণে তিনি ইসলামে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেন।
সাবার রানী বিলকিস
বিলকিস ছিলেন সাবার রানি। কোরআনে তাকে তার জনগণের একজন ক্ষমতাবান ও প্রজ্ঞাবান শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সুলাইমান (আ.) তাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। তার উপদেষ্টারা এর বিরোধিতা করলেও তিনি সুলাইমান (আ.)-এর কথার মধ্যে সত্য ও পবিত্রতা উপলব্ধি করেন এবং সত্যকে গ্রহণ করেন।
সুলাইমান (আ.) বললেন, তার সিংহাসনটি তার কাছে অপরিচিত করে দাও, আমরা দেখি সে সঠিক পথের সন্ধান পায় কি না অথবা সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা সঠিক পথের সন্ধান পায় না। অতঃপর যখন সে এলো, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এটি কি তোমার সিংহাসন? সে বলল, এটি যেন সেটিই। আমাদের আগেই জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল এবং আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। (সুরা আন-নামল, আয়াত : ৪১-৪২)
চারদিকে যখন মূর্তিপূজা ও অবিশ্বাসের আধিপত্য ছিল, তখন তিনি একত্ববাদের চূড়ান্ত সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার পথ গ্রহণ করেন।
লুত (আ.) ও নুহ (আ.)-এর স্ত্রী
কোরআনে আল্লাহ শুধু ঈমানদার নারীদের কথাই তুলে ধরেননি; এমন নারীদের কথাও বলেছেন, যারা জেনেশুনে আল্লাহকে অস্বীকার করেছিল এবং ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দুই নারীই ছিলেন দুই নবীর স্ত্রী।
তারা এমন স্বামীদের পেয়েছিলেন, যারা আল্লাহর মনোনীত নবী ছিলেন, তার কাছ থেকে ওহি পেতেন এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তারপরও তারা তাওহিদের বিশ্বাস গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
নবীদের স্ত্রী হয়েও তারা তাদের স্বামীদের সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। বরং তারা তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে। কোরআনে বলা হয়েছে—
আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য নুহের স্ত্রী ও লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। তারা দুজনই আমার দুই নেক বান্দার বিবাহবন্ধনে ছিল। কিন্তু তারা তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদের স্বামীরা তাদের কোনো কাজে আসেনি। তাদের বলা হয়েছিল, তোমরা অন্যদের সঙ্গে আগুনে প্রবেশ করো। (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত : ১০)
আল্লাহর নবীদের এত কাছাকাছি থাকা এবং তাদের মতো মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার পরও তারা আল্লাহর অসীম রহমত ও অনুগ্রহ থেকে উপকৃত হতে পারেনি। তারা নিজেদের কাজের কারণে আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয় এবং নিজেদের জন্যই সেই পরিণতি ডেকে আনে।
লুত (আ.)-এর স্ত্রী ওই অঞ্চলের অন্য অবিশ্বাসীদের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়। আর নুহ (আ.)-এর স্ত্রী মহাপ্লাবনে ডুবে যায়। অবিশ্বাসীদের পরিণতি ছিল এমনই।
কোরআনে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন আল্লাহ তায়ালা। তার বান্দাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এসব চরিত্রের মাধ্যমে এমন বিভিন্ন শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের জীবনে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।