অভাবের সময় মুমিনের মানসিকতা যেমন হওয়া উচিত
অভাব মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাগুলোর একটি। অর্থের সংকট, প্রয়োজন পূরণে অক্ষমতা, ঋণের চাপ কিংবা সংসারের বিভিন্ন চাহিদা—এসব কারণে মানুষ অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কখনো নিজের সামর্থ্য নিয়ে হতাশ হয়, কখনো অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে অভাব শুধু কষ্টের বিষয় নয়; মুমিনের জন্য একটি পরীক্ষা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি সুযোগও হতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
অভাবের সময় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— এই বিশ্বাস রাখা যে, এই পরিস্থিতিও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই অভাবের সময় হতাশ না হয়ে কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি।
১. অভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা
অভাব এলেই এমন মনে করা উচিত নয় যে, আল্লাহ আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন। বরং মুমিন জানে, সুখ যেমন পরীক্ষা, দুঃখও তেমনি পরীক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার সব বিষয়ই কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। সে সুখ লাভ করলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)
তাই অভাবের সময় প্রথম কাজ হলো পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আল্লাহ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা না করা।
২. হালাল উপার্জনের পথ না ছাড়া
অভাব মানুষকে দ্রুত অর্থ লাভের উপায় অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে । তখন সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জুয়া কিংবা হারাম উপার্জনের নানা পথ সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু অভাবের কারণে একজন মুমিনের জন্য হারাম বস্তু হালাল হয়ে যায় না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২–৩)
অভাব যত কঠিনই হোক, হালাল পথ আঁকড়ে ধরে থাকা মুমিনের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
৩. রিজিকের মালিক আল্লাহ— দৃঢ় বিশ্বাস রাখা
মানুষ সাধারণত নিজের চাকরি, ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তিকে রিজিকের উৎস মনে করে। অথচ এগুলো শুধু মাধ্যম। প্রকৃত রিজিকদাতা আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬)
এর অর্থ এই নয় যে মানুষ চেষ্টা করবে না। বরং চেষ্টা করবে, কিন্তু ফলাফলের জন্য তার ভরসা থাকবে আল্লাহর ওপর। চাকরি চলে গেলে, ব্যবসায় ক্ষতি হলে কিংবা কোনো সুযোগ হাতছাড়া হলে মুমিনের বিশ্বাস থাকা উচিত—রিজিকের একটি দরজা বন্ধ হলে আল্লাহ অন্য দরজা খুলে দিতে পারেন।
৪. দোয়া ও ইস্তিগফার বাড়িয়ে দেওয়া
অভাবের সময় মানুষ মানুষের কাছে বেশি ছোটাছুটি করে; কিন্তু মুমিনের প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালা হজরত নুহ (আ.)-এর বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন— ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী-নালা সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত : ১০–১২)
তাই অভাবের সময় ইস্তিগফার, দোয়া ও আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা উচিত।
৫. যতটুকু আছে, শুকরিয়া আদায় করা
অভাবের সময় মানুষ তার অপ্রাপ্তি নিয়ে হতাশায় থাকে। যা নেই তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। আল্লাহ তায়ালা অন্য আরও যেসব নেয়ামত দিয়েছেন তার মূল্যায়ন করে না।অথচ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১৮)
হয়তো অর্থ কম, কিন্তু পরিবার আছে; হয়তো বাড়ি ছোট, কিন্তু মাথা গোঁজার জায়গা আছে; হয়তো আয় সীমিত, কিন্তু শরীর সুস্থ। মুমিন উচিত নিয়ামতকে অস্বীকার না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
৬. অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা না করা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় সমস্যা হলো—মানুষ অন্যের বাহ্যিক জীবন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করতে শুরু করে। কারও নতুন গাড়ি, সুন্দর বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা বিলাসী জীবন দেখে নিজের অভাব আরও তীব্র মনে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থানে যারা আছে তাদের দিকে তাকাও, তোমাদের চেয়ে ওপরের অবস্থানে যারা আছে তাদের দিকে তাকিও না। এতে আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করার সম্ভাবনা বেশি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)
অন্যের সম্পদের সঙ্গে তুলনা করে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়।
৭. নিজেকে মূল্যহীন না ভাবা
ইসলামে সম্পদ থাকা যেমন অপরাধ নয়, তেমনি সীমিত সম্পদ থাকাও লজ্জার বিষয় নয়। মানুষের মর্যাদা তার সম্পদের পরিমাণে নির্ধারিত হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)
তাই অভাবের কারণে নিজেকে মূল্যহীন মনে করা ঠিক নয়। একজন দরিদ্র মুমিনও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান হতে পারেন।
৮. প্রয়োজন হলে কারো সহযোগিতা নেওয়া
তাওয়াক্কুল মানে মানুষের সাহায্য গ্রহণ না করা নয়। প্রয়োজন হলে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা বিশ্বস্ত মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ। তবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করাও জরুরি।
৯. দান করার সামর্থ্য না থাকলেও ভালো কাজ বন্ধ না করা
অনেকে মনে করেন, নিজেরই অভাব; অন্যকে কী দেব? অথচ দান শুধু অর্থ দিয়ে হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর সদকা রয়েছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, যদি সে তা না পায়? তিনি বললেন, সে নিজের হাতে কাজ করবে এবং নিজে উপকৃত হবে ও সদকা করবে। তারা বললেন, যদি সে তা করতে না পারে? তিনি বললেন, সে অভাবী ও প্রয়োজনগ্রস্তকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি সেটিও না পারে? তিনি বললেন, সে ভালো কাজের নির্দেশ দেবে। তারা বললেন, যদি সেটিও না পারে? তিনি বললেন, সে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে—এটাই তার জন্য সদকা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০৮)
অর্থাৎ অর্থের অভাব ভালো মানুষ হওয়ার পথে বাধা নয়।
১০. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
অভাব দীর্ঘ হলে মানুষের মনে প্রশ্ন আসতে পারে—আর কতদিন? আমার দোয়া কি কবুল হবে? পরিস্থিতি কি কখনো বদলাবে? এ সময় কোরআনের একটি আয়াত মনে রাখা জরুরি— ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত : ৫–৬)
আল্লাহ একই কথা পরপর দু’বার বলেছেন। অর্থাৎ কষ্টের সময়টি স্থায়ী নয়। রাত যেমন শেষ হয়, তেমনি মানুষের জীবনের কঠিন সময়ও একসময় পরিবর্তিত হয়। অভাবের সময় তাই মুমিনের মানসিকতা হওয়া উচিত—আমি চেষ্টা করব, হালাল পথ অবলম্বন করব, আল্লাহর কাছে চাইব, যা আছে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করব এবং যা নেই তার জন্য ধৈর্য ধরব।
অভাব মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, আবার আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীরও করে দিতে পারে। একই পরিস্থিতিতে একজন মানুষ হতাশ হয়ে পড়তে পারেন, আরেকজন সেই পরিস্থিতিকেই আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। পার্থক্যটা অনেক সময় পরিস্থিতিতে নয়, পরিস্থিতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।