চারঘাটে বিদ্যালয়ের জমি বিক্রি ও কোটি টাকা নয়ছয়'সহ ৮ আত্মীয়কে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ

Allegations of selling school land and hiring 8 relatives including 'Nayashay' worth crores of taka
আবুল কালাম আজাদ ২০ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৩৬ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ২০ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৩৬ অপরাহ্ন
চারঘাটে বিদ্যালয়ের জমি বিক্রি ও কোটি টাকা নয়ছয়'সহ  ৮ আত্মীয়কে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ
ইউসুফপুর কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ, জমি বিক্রি ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাবেক প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ, জমি বিক্রি ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাবেক প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ১৭ বছর প্রধান শিক্ষক থাকাকালে তিনি নিজের অন্তত আট আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। একই সময়ে বিদ্যালয়ের জমি বিক্রি এবং বিভিন্ন খাতের বিপুল অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।


ইমদাদুল ইসলাম ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২৫ সালে অবসরে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিদ্যালয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসী।


ইমদাদুল ইসলাম চারঘাট উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন বলে জানা গেছে।


নিয়োগে আত্মীয়করণ:-

বিদ্যালয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইমদাদুল ইসলাম প্রধান শিক্ষক থাকাকালে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল নিরাপত্তাকর্মী পদে মনোয়ার হোসেন, আয়া পদে দিপ্তী ঘোষ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে সাকিব হাসান যোগ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মনোয়ার হোসেন ও সাকিব হাসান ইমদাদুল ইসলামের ভাতিজা। আর দিপ্তী ঘোষ তাঁর শাশুড়ির সহপাঠী ছিলেন।


এর আগে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে যোগ দেন তরিকুল ইসলাম তুহিন। তিনিও ইমদাদুল ইসলামের ভাতিজা বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ পাওয়া শওকত আলী টিংকু তাঁর ভাগনে, একই পদে নিয়োগ পাওয়া মিরা খাতুন সৎ বোন এবং অফিস সহকারী রহিত তাঁর জামাতার ভাই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ে তাঁর শ্যালক আফরোজ হোসেনও চাকরি করছেন।


শ্যালকের সনদ নিয়েও প্রশ্ন:-

আফরোজ হোসেনের চাকরির সনদ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে গত বছর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বিদ্যালয়ের তৎকালীন অফিস সহায়ক আব্দুল হালিম।

অভিযোগে বলা হয়, আফরোজ হোসেন ১৯৯৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ল্যাব সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তাঁর সনদে জন্মতারিখ ছিল ১৯৭২ সালের ২ জুলাই। পরে ইমদাদুল ইসলাম প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি একই বিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান পদে যোগ দেন। তখন জমা দেওয়া সনদে জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয় ১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি।

এ কারণে সনদে তথ্যের অসঙ্গতি ও জালিয়াতির অভিযোগ তোলা হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আফরোজ হোসেন বলেন, ‘দ্বিতীয়বার কারিগরি ত্রুটির কারণে জন্মতারিখ ভুল হয়েছিল। পরে সেটা ঠিক করে নেওয়া হয়েছে। এমনিতেই ঠিক হয়ে গেছে।’


বিদ্যালয়ের জমি বিক্রির অভিযোগ:-

প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ইমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের জমি বিক্রির সুযোগ না থাকলেও উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুল হাসান মামুনের কাছে জমিটি বিক্রি করা হয়।

দলিলে জমিটির মূল্য তিন লাখ টাকা দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, ওই জমির প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল ১০ লাখ টাকার বেশি।

সে সময় বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। জমি বিক্রির অর্থ থেকে সাবেক প্রধান শিক্ষক ও তৎকালীন সভাপতি অনিয়ম করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।


বিভিন্ন খাতে কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ:-

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের সেশন ফি, ভর্তি ফি, কেন্দ্র ফি, সরকারি অনুদানসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়ম করেছেন সাবেক প্রধান শিক্ষক।

বিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহায়ক আব্দুল হালিমের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সেশন ফি থেকে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা নয়ছয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ভর্তি ফি থেকে ৪৪ লাখ, স্কুলের হাট ডাক থেকে ৮ লাখ, পুরোনো ভবন বিক্রি থেকে ৯৬ হাজার, গাছ বিক্রি থেকে ৬০ হাজার, পুরোনো বিজ্ঞান ভবনের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি থেকে ৯৬ হাজার এবং কেন্দ্র ফি বাবদ পাওয়া ২২ লাখ টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি অনুদানের ১২ লাখ টাকা এবং আরও বিভিন্ন খাতের অর্থের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আব্দুল হালিমের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য হয়েছে। এভাবে সাবেক প্রধান শিক্ষক অন্তত এক কোটি ৯০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ অডিট ও তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


বর্তমান প্রধান শিক্ষক যা বললেন:-

বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, অভিযোগ থাকলেও দায়িত্ব ছাড়ার আগে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল ইসলাম বিদ্যালয়ের খাতাপত্র ঠিকঠাক করে গেছেন। আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তা অডিট ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

আত্মীয়-স্বজনদের নিয়োগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিদ্যালয়ের জমি বিক্রির বিষয়টি সত্য বলে জানান তিনি।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আল-মামুন বলেন, তিনি পেশায় দলিল লেখক এবং বর্তমানে পেশাগত কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে বলেন তিনি।


পাওয়া যায়নি সাবেক প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য:-

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ইমদাদুল ইসলাম অনেকটা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য জানতে টানা কয়েক দিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও স্থানীয়দের দাবি, নিয়োগ, জমি বিক্রি এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এ জন্য শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।