রেলের ভুল সিদ্ধান্তে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হলেও নেই জবাবদিহিতা

Railways' wrong decision leads to loss of hundreds of crores of taka
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ::- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৩:০৪ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ::- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৩:০৪ অপরাহ্ন
রেলের ভুল সিদ্ধান্তে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হলেও নেই জবাবদিহিতা
রেলের ভুল সিদ্ধান্তে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হলেও নেই জবাবদিহিতা

ভুল সিদ্ধান্ত, অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির কারণে বাংলাদেশ রেলের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বা কেনা বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত কাজে না আসায় রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 


১২৫টি ওয়াগন এনে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা, কোটি টাকা ব্যয়ে আনা ডেমো সরঞ্জাম পড়ে থাকা এবং কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আনা ৩০ থেকে ৪০টি লোকোমোটিভের একটি অংশ বেয়ারিং সমস্যায় অচল হয়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি উঠেছে।


রেলসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ :-

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে রেলের সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তা অজানা থাকার কথা নয়। এরপরও কোনো প্রকল্প বা সরঞ্জাম বাস্তবায়ন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার দায়ভার কে নেবে—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, একদিকে যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার ও ট্রলির মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে রেলের বিভিন্ন প্রকল্প, কোচ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভ ব্যবস্থাপনায় ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিপুল অর্থের সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। বিশেষ করে ১২৫টি ওয়াগন আনার পর সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার বিষয়টি রেলের পরিকল্পনা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

একইভাবে কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আনা ৩০ থেকে ৪০টি লোকোমোটিভের বেশ কিছু বেয়ারিং সমস্যায় অচল হয়ে পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। সামান্য কারিগরি ত্রুটির কারণে এসব মূল্যবান লোকোমোটিভ দীর্ঘদিন সচল না হলে একদিকে রেলের পরিবহন সক্ষমতা কমে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বড় অংশ কার্যত অচল সম্পদে পরিণত হয়।

রেলের বিভিন্ন প্রকল্প ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি নতুন নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই, সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার পরিকল্পনা যথাযথভাবে করা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। ফলে প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি প্রকল্প-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ বা নতুন সরঞ্জাম কেনাই যথেষ্ট নয়। বর্তমানে রেলের হাতে থাকা লোকোমোটিভ, কোচ, ওয়াগন, ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অচল বা অব্যবহৃত সম্পদের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামত ও কার্যকর ব্যবহারের ব্যবস্থা নিতে হবে।


যাত্রীসেবায়ও বড় ঘাটতি:-

রেলের সম্পদ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা ও সহায়ক ব্যবস্থা নেই। কোনো প্রতিবন্ধী যাত্রী স্টেশনে প্রবেশের পর তাঁকে হুইলচেয়ার, ট্রলি বা অন্যান্য সহায়তার জন্য যেন ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

নতুন রেল প্রকল্প ও স্টেশন নির্মাণের সময় থেকেই প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, টিকিট কাউন্টার ও অন্যান্য স্থাপনায় হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সহজ চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।


বিদ্যমান স্টেশনগুলোও পর্যায়ক্রমে আধুনিকায়নের আওতায় আনার দাবি রয়েছে। একসঙ্গে সব স্টেশন উন্নয়ন সম্ভব না হলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর, ইন্টারচেঞ্জ ও অধিক যাত্রীসমাগম হয়—এমন স্টেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন কোচে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের প্রবেশ ও চলাচলের সুবিধা, প্রবেশগম্য টয়লেট, পর্যাপ্ত দরজা ও হ্যান্ডরেল নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবায় প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, এসব সুবিধা বাস্তবে যাত্রীরা ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তাও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।


রক্ষণাবেক্ষণেও নজর জরুরি:-

যাত্রীসেবার মান বাড়াতে রেলের বিদ্যমান অবকাঠামো ও সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। স্টেশন ও ট্রেনের ওয়াশরুম পরিচ্ছন্ন রাখা, ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সচল রাখা, ট্রেনে ওঠানামার সময় হুইলচেয়ার ও ট্রলির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং যাত্রীছাউনি ও ওয়েটিং রুম ব্যবহার উপযোগী রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের হাতে থাকা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় না করেও যাত্রীসেবার মান অনেকটাই উন্নত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ অব্যবহৃত রেখে দেওয়ার ঘটনায় দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।


তাঁদের দাবি, রেলের পুরোনো প্রকল্প ও ক্রয় সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করে কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কোন সম্পদ কেন অব্যবহৃত রয়েছে এবং কেন তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ও কমবে।