শব্দের মারপ্যাঁচে বাংলাদেশে সমকামিতা বৈধ করার প্রক্রিয়া চলছে

The process of legalizing homosexuality is underway in Bangladesh
বিশেষ প্রতিবেদক:- ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
বিশেষ প্রতিবেদক:- ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ন
শব্দের মারপ্যাঁচে বাংলাদেশে সমকামিতা বৈধ করার প্রক্রিয়া চলছে
ছবি - বিজয় বাংলা


মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশে শব্দের মারপ্যাঁচে এলজিবিটি তথা সমকামিতা বৈধ করার প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি বলেন, দেশে পরিবার ও ঈমান বিধ্বংসী ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও সমকামিতা প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত চলছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য ট্রান্সজেন্ডারবাদ প্রত্যাখান করে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ‘দ্বি-লিঙ্গ নীতি’ চাই। ট্রান্সজেন্ডারবান্ধব সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ বাতিলের পাশাপাশি আমরা সরকারের সব স্তরে দ্বি-লিঙ্গ নীতির দাবি জানাই।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে তিনি একথা বলেন।

ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, আজকের এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ বাতিলের পাশাপাশি আমরা সরকারের সব স্তরে দ্বি-লিঙ্গ নীতির দাবি জানাচ্ছি।

দাবিগুলো হলো:-

১. ‘স্বীকৃত লিঙ্গ’ হবে জন্মগত বায়োলজিক্যাল লিঙ্গের ভিত্তিতে এবং তা হবে কেবল দুটি— নারী ও পুরুষ। ‘হিজড়া’-গণ জন্মগত লিঙ্গ প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃত হবে; তবে তা মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, মৌখিক দাবির ভিত্তিতে নয়।

২. সকল প্রকার সরকারি নীতি, নথি, ফরম ও পরিচয়পত্রে কেবলমাত্র ‘লিঙ্গ’ শব্দটি (জৈবিক লিঙ্গ) ব্যবহৃত হবে; ‘জেন্ডার’ শব্দ বা জেন্ডার পরিভাষা ব্যবহার করা যাবে না।

৩. জেন্ডারবাদকে চরমপন্থা হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিহত করতে হবে।

মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ড. সরোয়ার বলেন, অগণিত ইসলামপ্রেমিক জনতার রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে ইসলামের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক এলজিবিটি গোষ্ঠীর প্রতি সুস্পষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা বিদ্যমান ছিল। যার মধ্যে রয়েছে-

১. ঈদ শোভাযাত্রায় সমকামিতার প্রতীক ইউনিকর্নের প্রদর্শনী,

২. নববর্ষের ড্রোন শো-র ডিসপ্লেতে সমকামিতার প্রতীক “গে এঞ্জেল” প্রদর্শন,

৩. বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবনায় ভাষার মারপ্যাঁচে এলজিবিটি তথা সমকামী অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা,

৪. ট্রান্সজেন্ডার ও পতিতাদের ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘মৈত্রীযাত্রা’য় সরকারঘনিষ্ঠ ও সরকারের বিভিন্ন

৫. সংস্কার কমিশনের সদস্যদের অংশগ্রহণ,

৬. সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক নিজ হাতে একজন জন্মগত পুরুষকে ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’ প্রদান,

৭. সমকামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুবিধার্থে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়’ নামকরণ,

৮. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০২৬-এর প্রবেশপথে এলজিবিটি-র প্রতীক রংধনুর আদলে স্তম্ভ স্থাপন,

৯. পোশাক শিল্পসহ দেশের প্রত্যেক কর্মক্ষেত্রে সমকামী-বান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে শ্রম আইন সংস্কারের নামে ILO C190 সনদের অনুমোদন,

১০. আলেম ও সচেতন নাগরিকদের শত অনুরোধ উপেক্ষা করে সমকামিতার ধ্বজাধারী জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিস খোলা,

১১. এলজিবিটিকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জুলাই সনদ ও গণভোটকে বিতর্কিত করা।

তিনি বলেন, ড. ইউনূস সরকারের এই সব পদক্ষেপ ট্রান্সজেন্ডার ও এলজিবিটি গোষ্ঠীর দুঃসাহসকে এই পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছিল যে একজন ট্রান্সজেন্ডার প্রকাশ্যে দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মাহতাব ও আমাকে (ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন) হত্যার হুমকি ও উস্কানি দিয়েছে, তাদের মাথা কেটে তা দিয়ে ফুটবল খেলার স্পর্ধা দেখিয়ে কার্টুন এঁকেছে। একাধিকবার জিডি করার পরও সে যে কেবল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে তা-ই নয়, প্রকাশ্যে শহীদ মিনারে সমকামী বিয়ের দাবিতে অনশন করেছে।

ড. সরোয়ার বলেন, সেই ইউনূস সরকারের জারি করা ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বর্তমান সরকার প্রশ্নহীনভাবে পাস করেছে। এই সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬-এ কোনো প্রকার স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান ছাড়াই ‘জেন্ডার’, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’, ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’, ‘বৈষম্যমূলক জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ কিংবা ‘জেন্ডারভিত্তিক অন্যান্য আচরণ’—এই এলজিবিটিবান্ধব পরিভাষাগুলো সংযোজন করা হয়েছে; ফলে ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও সমকামিতা পরোক্ষভাবে বৈধতা পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে একদিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রকাশ্যে সমকামী বিয়ের আয়োজন হলো, প্রশাসন নির্বিকার। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিবিএস এলজিবিটি নীতি গ্রহণ করেছে, তারা ট্রান্সজেন্ডারকেও হিজড়া হিসেবে বিবেচনা করার নীতিমালা ঘোষণা দিয়েছে। অথচ এটা এখন সবাই জানে যে হিজড়া হচ্ছে জন্মগত লিঙ্গ প্রতিবন্ধী, অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডার হচ্ছে নারী সাজা জন্মগত পুরুষ বা পুরুষ সাজা জন্মগত নারী।

‘অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ইনক্লুসিভ শিক্ষার কথা বলছেন, Play Lab মডেলের কথা বলছেন। যে Gender Transformative Approach থেকে শরীফ-শরীফার গল্পটি জন্ম নিয়েছিল, সেই একই অ্যাপ্রোচে Play Lab মডেলটি সাজানো হয়েছে।’

ড. সরোয়ার বলেন, জেন্ডার শব্দ বা জেন্ডার পরিভাষা সম্পূর্ণরূপে সমকামী-বান্ধব, ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক টার্ম সম্পূর্ণরূপে সমকামী-বান্ধব। এটা কেউ তা অস্বীকার করতে চাইলে আমরা তাকে ওপেন ডিবেটের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি।

তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা জানাতে চাই, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের বাইরে আর কোনো লিঙ্গের স্বীকৃতি নেই। পাসপোর্ট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কোনো ফরমে ‘নারী-পুরুষ’-এর বাইরে আর কোনো অপশন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সকল নথি থেকে ‘জেন্ডার’ শব্দটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার পরিবর্তে ‘সেক্স’ (জন্মগত লিঙ্গ) শব্দ বসানো হয়েছে।

 যুক্তরাষ্ট্রে লিঙ্গ (Sex)-এর প্রতিস্থাপন হিসেবে লিঙ্গ পরিচয়কে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘জেন্ডারবাদ’-কে ‘চরমপন্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ‘ট্রান্সজেন্ডারবাদ’-কে ‘উন্মাদনা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সহ ডিইআই কর্মসূচিকে ‘উগ্র ও অপচয়‍মূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দেওয়‍া হয়‍েছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া সহ ওআইসি এবং মুসলিম বিশ্ব জেন্ডারবাদের বিপক্ষে। অন্যদিকে জেন্ডারবাদের পক্ষে রয়েছে মূলত জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। লিবিয়ার শরিয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ কাউন্সিল ‘সামাজিক লিঙ্গ’ তথা ‘জেন্ডার’ পরিভাষার ব্যবহার হারাম ঘোষণা করেছে। জেন্ডারবাদ থেকে উদ্ভূত ট্রান্সজেন্ডারবাদকে কুফরি আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ, সৌদি আরব এবং ওআইসির ফতোয়‍া বোর্ডসহ বিশ্বের বড় বড় ইসলামিক প্রতিষ্ঠানসমূহ।