হাতে চলে কাঁচি, হৃদয়ে বাজে সুর

সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৬:১৭ অপরাহ্ন সারা বাংলা
সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৬:১৭ অপরাহ্ন
হাতে চলে কাঁচি, হৃদয়ে বাজে সুর
হাতে চলে কাঁচি, হৃদয়ে বাজে সুর

বর্ষপঞ্জিতে শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র  মাস চললেও বৃষ্টির দেখা পাওয়া ভার। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ দেহমন। এই 'তাল পাকা' গরম আর কাঠফাটা রোদে চাতক যেমন বৃষ্টির জন্য চেয়ে থাকে তেমনি 

রোদে বসে কাস্টমারের অপেক্ষায় বসে আছেন হরেন সরদার (৬৬)। তিনি হাটে হাটে ভ্রাম্যমাণ দোকান দিয়ে চুল কাটেন। তবে বৃষ্টি আসলে দোকানের সরঞ্জাম গুটিয়ে নিতে হয়। তখন শুধুই বসে থাকা। এসময় মনের অজান্তেই গুনগুন করে গেয়ে উঠেন গান। 

হাতে কাঁচি চললেও হরেন সরদারের মনে বেজে উঠে সুর। চুল কাটা পেশার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কীবোর্ড (ক্যাসিয়ো) বাজান। তাঁর বাজনার একটা দল আছে। 

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের ডিমা গ্রামে হরেন সরদারের বাড়ি। পেশা চুল কাটা হলেও সুর আর সংগীতের নেশার টানে কীবোর্ড হাতে ছুটে যান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। 

তিনি নিয়ামতপুর উপজেলা ছাড়াও আশেপাশের অনেক জেলা-উপজেলায় বাজাতে যান। 

গত কয়েকদিন আগে  নিয়ামতপুর হাটে কাজের ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।  কীবোর্ড বাজানো শেখার ইতিহাস জানতে চাইলে চোখ বন্ধ করে  স্মৃতি হাতড়াতে শুরু করলেন। 

 চোখ খুলে বলতে থাকলেন, জীবিকার শুরুতে দিনমজুর  ও চুল কাটার কাজ করতেন তিনি। পাশের বাড়ির গোষ্ট গোপাল বাজাতেন দোতারা। সেই সুরটা মনে লেগে যায় তাঁর। একদিন বসলেন গোষ্ট গোপালের কাছে। নিতে চাইলেন তালিম। হতে চান শিষ্য। হরেনের প্রবল আগ্রহ দেখে গোষ্ট গোপাল তাোকে শিখালেন। আস্তে আস্তে রপ্ত করলেন দোতারা। তারপরে কীবোর্ড (ক্যাসিয়ো)।

এবারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজনা বাজানোর জন্য পাঁচজনের একটি দল গঠন করলেন তিনি। এলাকার নানা জায়গায়  বিয়ে, অন্নপ্রাশন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবসে বাজানো শুরু করলেন। এভাবে প্রায় ৪০ বছর ধরে বাজিয়ে যাচ্ছেন। 

কথায় কথায় জানালেন, তাঁর চার মেয়ে।  তিন ছেলে। চার মেয়ে আর এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। মেজো ছেলেকে কীবোর্ড বাজানো শিখেয়েছেন। তবে এখনো কোনো প্রোগ্রামে পাঠাননি। তাঁর ইচ্ছা, মেজো ছেলেটা এই ক্যাসিয়ো বাজানোটা ধরে রাখুক। 

 সপ্তাহে চারদিন তিনটি হাটে চুল কাটার কাজ করেন হরেন সরদার । বাকি দিনগুলোতে কৃষি কাজ করেন। তাঁর নিজের বাড়ি ছাড়া কোনো কৃষি জমি নেই। 

হরেন সরদার আরও জানালেন, অনুষ্ঠানে কীবোর্ড  বাজানোর জন্য মাইক, এমপ্লিফায়ার, ব্যাটারি, মাইক্রোফোনসহ আনুষাঙ্গিক সরঞ্জাম  দোকান থেকে ভাড়া করতে হয়। দলের অন্যান্য সদস্যদেরকে পারিশ্রমিক  দিতে হয়।  এসব খরচ করার পর অনেক সময় তাঁর নিজের কোনো লাভই  থাকে না। অনেক জায়গায় বাজনা বাজিয়ে 'খালি হাতেই' ফিরতে হয়। 

সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে আহবান জানিয়ে তিনি বলেন,  কেউ একটা মাইক,  এমপ্লিফায়ার, ব্যাটারি, মাইক্রোফোন কিনে দিলে খুব উপকার হতো। বাজনা দলের জন্য একটা ইউনিফর্মও (পোশাক) দরকার।

হরেন সরদারের পাশের গ্রামের 

মনসুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জানালেন, তিনি অনেকদিন ধরে হরেনের ক্যাসিয়ো বাজানো শুনে আসছেন। শত কষ্ট, অসুবিধা  ও দারিদ্র্যের মধ্যেও খুব সুন্দর করে বাজান। তাঁর এই  সঙ্গীত প্রতিভা দেখে খুবই ভালো লাগে। সমাজের কোনো সহৃদয়বান কোনো ব্যক্তি তাঁকে আর্থিক সাহায্য করলে তাঁর জন্য উপকার হতো। স্বাচ্ছন্দ্যে সঙ্গীত সাধনটা চালিয়ে যেতে পারতো। 

হরেনের বাজনা দলে ড্রাম বাজান ভাবিচা গ্রামের

হরেকৃষ্ট সরদার। তিনি জানালেন, অনেকদিন ধরে তিনি হরেন সরদারের বাজনা দলে ড্রাম বাজান। হরেন খুব ভালো ক্যাসিয়ো বাজান। 

ভাবিচা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ বলেন, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদে ওইরকম কোনো বাজেট নেই। তারপরও

তিনি বিষয়টা আমাদের জানালে পরিষদের পক্ষ থেকে কোনোভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করা হবে।