রাবির প্রশাসনে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে বিধিবিধান অনুসরণ ॥ অবৈধ সুবিধা না দেওয়ায় অপপ্রচারের অভিযোগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময়কে ঘিরে নানা সমালোচনা থাকলেও তাঁর কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—নিয়মের বাইরে গিয়ে সুবিধা না দেওয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিবিধান অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁর কঠোর অবস্থান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপের চেয়ে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এ কারণেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে ‘দীর্ঘসূত্রতার’ অভিযোগ উঠলেও তাঁর সমর্থকদের ভাষ্য, এর পেছনে ছিল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা।
রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ, পদায়ন, বিভিন্ন আবেদন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও নথি নিষ্পত্তিতে বিধিবিধান অনুসরণে গুরুত্ব দিয়েছেন মাসউদ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাহিদার ভিত্তিতে নয়, সংশ্লিষ্ট নথি ও বিধিগত প্রক্রিয়া যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
‘অবৈধ সুবিধা না দেওয়াই বিরোধিতার কারণ’:-
অধ্যাপক মাসউদের নিজের বক্তব্যেও তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট। তাঁর দাবি, যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছেন, তাঁদের একটি অংশ মূলত তাঁর কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে পারেননি বলেই ক্ষুব্ধ।
তিনি বলেন, “যারা এসব অভিযোগ করছেন, তাদের প্রমাণ দিতে বলুন। আমি দেখলাম সেসব মানুষই এসব মিথ্যাচার করছে, যাদের আমি কোনো অবৈধ সুবিধা দিইনি, যারা অবৈধ সুবিধা নিতে পারেনি, তাদেরই একটি অংশ নানাভাবে এসব লিখছে। অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তারা দেবে।”
তাঁর বক্তব্য—প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চাপ কিংবা সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতির পরিবর্তে বিধিবিধানকে সব সময় প্রাধান্য দিয়েছন।
দীর্ঘসূত্রতা নয়, প্রক্রিয়া অনুসরণের চেষ্টা:-
মাসউদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো বিভিন্ন ফাইল ও প্রশাসনিক কাজে বিলম্ব। তবে তাঁর পক্ষের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কোনো ফাইল নিষ্পত্তি সবসময় একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত, নথিপত্র যাচাই, বিধিগত অবস্থান এবং অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।ফলে কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি না হলেই সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা বলা যায় না।
তিনি এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন যেখানে ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার চেয়ে ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগলেও এর মাধ্যমে নিয়মের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি কমেছে।
দুর্নীতি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়?:-
মাসউদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা ও অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় একটি অংশ তাঁর প্রশাসনিক আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিংবা ব্যক্তিগত আচরণকে কেন্দ্র করে।
অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, নিয়োগ-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগতভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অবশ্য কোনো অভিযোগের প্রমাণ প্রকাশ্যে না থাকাকে অভিযোগের সম্পূর্ণ অসত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণও বলা যায় না। তবে প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করাও সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।এই জায়গাতেই মাসউদের বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ—তিনি অভিযোগকারীদের কাছে প্রমাণ দাবি করেছেন।
তথ্য প্রকাশেও দাপ্তরিক নিয়ম:-
সাংবাদিকদের তথ্য না দেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথির সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশযোগ্য নয়। বিশেষ করে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, ব্যক্তিগত তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা সংবেদনশীল প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকতে পারে।
মাসউদের পক্ষের বক্তব্য হলো, সাংবাদিকদের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। ফলে তথ্য পেতে বিলম্ব হওয়াকে তাঁর সমর্থকেরা তথ্য গোপনের পরিবর্তে প্রশাসনিক সতর্কতা হিসেবে দেখছেন।
মেধার স্বাক্ষর শিক্ষাজীবনেই:-
প্রশাসনিক পরিচয়ের বাইরে অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদের রয়েছে দীর্ঘ একাডেমিক পরিচয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের এই শিক্ষক দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করছেন।
শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। অনার্স ও মাস্টার্স—উভয় পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিষয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের বিরল কৃতিত্বের জন্য তিনি পুরস্কৃত হন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে।
অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা:-
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অধ্যাপক মাসউদের সোচ্চার থাকার বিষয়টিও তাঁর ইতিবাচক পরিচয়ের অন্যতম দিক হিসেবে উল্লেখ করেন তাঁর সহকর্মীরা।
তাঁদের মতে, কোনো পক্ষের চাপ বা ব্যক্তিগত সুবিধার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক বিধি অনুসরণ করার প্রবণতা তাঁর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার সময়ও তিনি একই অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমে বিলম্বের অভিযোগ থাকলেও এসব অভিযোগের পক্ষে নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না এলে সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ব্যক্তিকে নয়, কর্মকেই মূল্যায়ন:-
অধ্যাপক মাসউদের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। সমালোচনা গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ। তবে একজন শিক্ষক ও প্রশাসককে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পরিবর্তে তাঁর সিদ্ধান্ত, নথি, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং প্রমাণযোগ্য তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মাসউদের ক্ষেত্রে সমালোচনার পাশাপাশি যে বিষয়গুলো সামনে আসে, সেগুলো হলো—দীর্ঘ শিক্ষকতা, শিক্ষাজীবনের অসাধারণ কৃতিত্ব, প্রশাসনিক দায়িত্বে বিধিবিধান অনুসরণের চেষ্টা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান।
ফলে তাঁর দায়িত্বকালকে একতরফা অভিযোগের আলোকে নয়, বরং কোন সিদ্ধান্তে তিনি কীভাবে বিধি অনুসরণ করেছেন, কোথায় অনিয়ম প্রতিরোধ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কারণ প্রশাসনে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে নিয়ম মেনে চলা অনেক সময় কঠিন; আর নিয়মের বাইরে সুবিধা না দেওয়ার সিদ্ধান্তই কখনো কখনো একজন কর্মকর্তার জন্য সবচেয়ে বড় সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।