রাজশাহীতে শিশুদের তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ, আতঙ্কে অভিভাবকেরা

Allegations of attempted abduction of children
আবুল কালাম আজাদ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৩৮ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৩৮ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে শিশুদের তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ, আতঙ্কে অভিভাবকেরা
রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় শিশু-কিশোরদের তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। প্রতিকী ছবি

রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় শিশু-কিশোরদের তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। 

গত কয়েক মাসে একই এলাকায় অন্তত চার শিশুকে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


 সর্বশেষ গত রোববার (৩০ আগস্ট) পারিলা ও পার্শ্ববর্তী কাটাখালী থানার নওদাপাড়া এলাকায় একই দিনে দুই শিশুকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাদের অভিভাবকেরা। ঘটনাগুলোর নেপথ্যে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী—এখনও তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

সর্বশেষ ঘটনার একটি বিষয়ে কাটাখালী থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং ঘটনাটি তাদের কাছে ‘রহস্যজনক’ মনে হয়েছে। তবে পবা থানার ওসি জানিয়েছেন, শিশু অপহরণের চেষ্টার কোনো লিখিত অভিযোগ তাঁর থানায় নেই।


সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা:-

কাটাখালী থানায় দেওয়া অভিযোগে সাদ্দাম হোসেন উল্লেখ করেন, তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে তামিম হোসেনকে গত রোববার দুপুরে বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে যাওয়ার সময় তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, তামিম বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে তাকে ছুরি দেখিয়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন। ভয় পেয়ে তামিম দৌড়ে স্থানীয় ফেনু নামের এক ব্যক্তির কাছে আশ্রয় নেয়। পরে ওই ব্যক্তিরা মাইক্রোবাস নিয়ে দ্রুত চলে যায়।

সাদ্দাম হোসেনের দাবি, প্রায় তিন বছর আগেও তাঁর ছেলেকে একইভাবে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই ঘটনাটি ঘটেছিল নওদাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠসংলগ্ন এলাকায়।


মোটরসাইকেলে এসে শিশুর চোখে স্প্রে:-

একই দিন পারিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহির শাহরিয়ারকেও তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা সবুজ ইসলাম।

তিনি জানান, বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান থাকায় রোববার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে মাহির বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশে বের হয়। বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে যাওয়ার পর মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তার ছেলেকে থামায়। একজন তার হাত ধরেন এবং পেছনে থাকা ব্যক্তি চোখে কোনো ধরনের স্প্রে করেন বলে অভিযোগ করেন সবুজ।

এ সময় মাহির দৌড়ে পাশের একটি বাড়ির গলিতে ঢুকে পড়ায় তাকে নিয়ে যেতে পারেনি তারা। সবুজের দাবি, স্প্রে করার কারণে ঘটনার পরও তাঁর ছেলের চোখ লাল হয়ে ছিল।তবে এ ঘটনায় তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি।


‘আব্বু পাঠিয়েছে’ বলে গাড়িতে তোলার চেষ্টা:-

এর আগে পারিলা ইউনিয়নের পারিলা এলাকায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরাফাতকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। তার বাবা নীলবর আলী জানান, প্রায় ২২ দিন আগে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তাঁর ছেলেকে থামিয়ে বলে, ‘তোমার আব্বু আমাদের নিতে পাঠিয়েছে, গাড়িতে চলো।’

বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আরাফাত তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। তখন তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন নীলবর। একপর্যায়ে দৌড়ে পালিয়ে রক্ষা পায় শিশুটি।


নীলবর বলেন, “আমি কখনো কাউকে ছেলেকে নিতে পাঠাই না। তাই সে তাদের সঙ্গে যায়নি। তখন তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আমার ছেলে দৌড়ে কোনোরকমে রক্ষা পায়।”

তিনি জানান, ঘটনাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পবা ও কাটাখালী থানার পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়েছেন। তবে পরে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানতে পারেননি বলে দাবি তাঁর।


বৈদ্যুতিক শক দিয়ে কিশোরকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা:-

তরফপারিলা গ্রামের মৎস্যচাষী শফিউর রহমানের অভিযোগ, প্রায় দুই মাস আগে এশার নামাজ শেষে তাঁর ছেলে আসাদুল্লাহ গালিব মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার সময় চার ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার চেষ্টা করে।

শফিউর রহমানের ভাষ্য, বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে ওই ব্যক্তিরা ইলেকট্রিক গান ব্যবহার করে তাঁর ছেলেকে বৈদ্যুতিক শক দেয়। এরপর তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গালিব কোনোভাবে পালিয়ে বাড়ির দিকে ছুটে যায় এবং বাড়ির সামনে গিয়ে পড়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন।

বিষয়টি কাটাখালী থানাকে জানানো হলেও এ ঘটনায় মামলা করেননি বলে জানান শফিউর রহমান।


অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ:-

একই এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে পরপর এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ সন্তানদের একা স্কুলে বা বাইরে যেতে দিতে চাইছেন না।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—একই এলাকায় বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও ঘটনাগুলোর নেপথ্যে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং শিশুদের লক্ষ্য করে কেন এমন চেষ্টা করা হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ বলেন, তিনিও ঘটনাগুলোর কথা শুনেছেন। সর্বশেষ ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে তিনি গ্রাম পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যকে শিশুটির বাড়িতে যেতে বলেছেন। নিজেও বিষয়টি দেখবেন বলে জানান তিনি।


তদন্তে ‘রহস্যজনক’ দেখছে পুলিশ:-

পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন বলেন, “শিশুকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে—এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। থানায় লিখিত কোনো অভিযোগও নেই।”

তবে কাটাখালী থানার ওসি মো. নুরুজ্জামান রোববার একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। আমরা তদন্ত করছি। বিষয়টি রহস্যজনক। তদন্ত শেষে মন্তব্য করব।”


আরএমপির মুখপাত্র উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, একই এলাকায় শিশু অপহরণের এমন কয়েকটি চেষ্টার বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই। থানায় অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন জানিয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে।


অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে, দরকার সমন্বিত উদ্যোগ:-

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণের প্রবণতা বাড়ছে কি না, তা নির্দিষ্টভাবে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধের ধরন ও কৌশলেও পরিবর্তন আসছে।

তাঁর মতে, সামাজিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তনসহ নানা কারণে অপরাধের নতুন প্রবণতা তৈরি হতে পারে। নতুন কৌশলে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সেই অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, অপরাধের নতুন ধরন ও কারণ চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


তদন্তেই মিলতে পারে ঘটনার আসল রহস্য:-

পারিলা ও আশপাশের এলাকায় শিশু-কিশোরদের তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে কোথাও মাইক্রোবাস, কোথাও মোটরসাইকেল, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক শক বা স্প্রে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

তাই প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাইয়ের পাশাপাশি ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


পুলিশের তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসার পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন অভিভাবকদের।