মোহনপুরে এলজিইডির সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার॥ প্রকৌশলী-ঠিকাদারের যোগসাজশের অভিযোগ
রাজশাহীর মোহনপুরে প্রায় পৌনে সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক পাকাকরণ কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, ব্যাপক ধীরগতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের ইটের খোয়া, গুঁড়া ও ধুলোমিশ্রিত রাবিশ ব্যবহারের চিত্র দেখা গেছে সরেজমিনে। অভিযোগ উঠেছে, পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অশুভ যোগসাজশ রয়েছে।
উপজেলার সইপাড়া থেকে গোল্লাপাড়া পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৫০ মিটার সড়ক পাকাকরণের প্রাক্কলিত দুই বছর মেয়াদের প্রায় ৯ মাস পার হলেও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতির দেখা মেলেনি। উল্টো সড়কের মূল স্তর তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে মানহীন উপকরণ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা ও নিম্নমানের ইট। শ্রমিকরা হস্তচালিত যন্ত্র দিয়ে তা সমতল করার চেষ্টা করছেন। কোথাও বড় ইটের টুকরো, আবার কোথাও ইট-পাথরের গুঁড়া ও মাটিযুক্ত রাবিশ ছিটিয়ে ভরাট করা হচ্ছে সড়কের খানাখন্দ।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন:-
প্রকাশিত প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যে কাজটি সৈকত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর হিসেবে মোছা. শাহেদা বেগমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কাজটির সঙ্গে রাজশাহীর ঠিকাদার মামুনের সম্পৃক্ততার কথা বলা হচ্ছে। এ কারণে প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বৈধ প্রতিনিধি, সাব-কন্ট্রাক্ট এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কাজ পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের ভূমিকা—সবকিছুই যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই উপজেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক:-
সড়কটি শুধু স্থানীয় যোগাযোগের জন্য নয়, মোহনপুর ও তানোরের মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন সড়কটি সরু ও দুরবস্থায় থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও রোগীদের যাতায়াতসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ছিল। উন্নয়নকাজ শেষ হলে দুই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরুতেই নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে হস্তান্তরের অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটি ধসে পড়া বা ফাটল ধরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তুলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয়।
‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি’র অজুহাত ঠিকাদারের, সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ:-
কাজের অনিয়ম ও উপকরণের সার্বিক মান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং ঠিকাদার মামুনের ম্যানেজার শামীম দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দাঁড় করান। তাঁর দাবি, বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় কাজের নির্ধারিত ব্যয় সমন্বয়ে সমস্যা হচ্ছে।
পরবর্তীতে বক্তব্য নিতে ঠিকাদার মামুনের কার্যালয়ে গেলে উপস্থিত তাঁর কয়েকজন সহযোগী সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছুড়ে দেন।
‘টাকা পাননি?’— সরকারি প্রকৌশলীর বিতর্কিত ভূমিকা
প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে থাকা মোহনপুর উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী রিপন আলী সরকারের ভূমিকায় সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
কাজের মানহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি কোনো দাপ্তরিক পদক্ষেপ বা তদন্তের নিশ্চয়তা না দিয়ে ঠিকাদারের থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন এবং তিনি সংবাদকর্মীকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন— “আপনি তো গিয়েছিলেন, মামুন ভাই টাকা দেননি? আমি তো বলে দিয়েছিলাম টাকা দেওয়ার জন্য।”
একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার মুখ থেকে অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত এমন মন্তব্যের পর বিষয়টি সংবাদে না প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের নিজ দপ্তরে ডেকে অনুরোধ জানান তিনি।
‘ঠিকাদারের সাথে কথা বলুন’ — নির্বাহী প্রকৌশলীর অস্পষ্ট অবস্থান:-
পুরো বিষয়ে মাঠপর্যায়ের চিত্র জানিয়ে রাজশাহী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন) আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনুসন্ধানী বিষয়টিতে আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেননি। উল্টো ঠিকাদার মামুনের সঙ্গেই কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পরবর্তীতে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করা হলে ‘মিটিংয়ে ব্যস্ত’ থাকার অজুহাতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং তাৎক্ষণিক কোনো মান যাচাই প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেননি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ও এলাকাবাসীর দাবি:-
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের বেড, সাব-বেস ও বেস কোর্সে নির্ধারিত মান অনুসরণ না করা হলে খুব দ্রুতই সড়কে গর্ত সৃষ্টি হয় ও দেবে যায়। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অপচয় হওয়ার জোরালো আশঙ্কা থেকে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র দাবি, বিষয়টি কেবল স্থানীয় তদারকিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এলজিইডির ঢাকা সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করানো হোক। ব্যবহৃত উপকরণের ল্যাব টেস্ট, প্রকল্পের কারিগরি নকশা অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখে অবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।