মরদেহ নিয়ে রহস্য

২০২৩ সালে মরা হেফাজ উদ্দিনের ২০২৬ সালে দাফন

Mystery about the body
রাজশাহী প্রতিনিধি: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৬ অপরাহ্ন সারা বাংলা
রাজশাহী প্রতিনিধি: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৬ অপরাহ্ন
২০২৩ সালে মরা হেফাজ উদ্দিনের ২০২৬ সালে দাফন
প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে মারা গেছেন রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হেফাজ উদ্দিন—এমন তথ্য জানিয়েছেন তার স্বজন, প্রতিবেশী ও সাবেক পরিচিতরা।

প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে মারা গেছেন রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হেফাজ উদ্দিন—এমন তথ্য জানিয়েছেন তার স্বজন, প্রতিবেশী ও সাবেক পরিচিতরা। অথচ সরকারি নথিতে তার মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ এবং মৃত্যুর স্থান ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতাল উল্লেখ করে ২৮ জুলাই রাতে রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে একটি মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—২০২৩ সালে মারা যাওয়া হেফাজ উদ্দিনের নামে ২০২৬ সালে দাফন করা মরদেহটি আসলে কার?

গোরস্থান-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, দাফনের সময় হেফাজ উদ্দিনের জাতীয় পরিচয়পত্র, সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সনদ জমা দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের ফর্মে মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ এবং মৃত্যুর স্থান ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতাল উল্লেখ রয়েছে।

তবে হেফাজ উদ্দিনের পরিচিতজনদের বক্তব্য এর সঙ্গে মিলছে না। তার বাড়ির গার্ড সাইফুল, প্রতিবেশী ও স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার জানিয়েছেন, তিনি কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া একাধিক পোস্টেও তার মৃত্যুর তারিখ ১৭ মার্চ ২০২৩ উল্লেখ রয়েছে।

২৮ জুলাই রাত আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি টিকাপাড়া গোরস্থানে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী সিকান্দার আলীর দাবি, অ্যাম্বুলেন্স থেকে একটি কফিন নামিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি গোরস্থানে প্রবেশ করেন। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মরদেহটি কলকাতা থেকে এসেছে এবং পথে দেরি হওয়ায় রাতে দাফন করতে হচ্ছে।

সিকান্দারের ভাষ্য, গোরস্থানের ভেতরে বাদশা নামে এক ব্যক্তি আরও দুজনকে নিয়ে কবর খনন করছিলেন। কফিন বহন ও দাফনের কাজে তিনি নিজেও সহযোগিতা করেন। তবে তার দাবি, সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের কাউকে কফিনে হাত দিতে, মাটি দিতে বা দোয়া পড়তে দেখা যায়নি। কফিনের আকৃতি নিয়েও তার সন্দেহ তৈরি হয়। তবে তিনি কফিনের ভেতরের মরদেহ সরাসরি শনাক্ত করতে পারেননি।

নথিতে সনাক্তকারী হিসেবে হেফাজ উদ্দিনের ছেলে তৌফিক তানভীর ও আবু জাফর তমালের নাম রয়েছে। তৌফিক প্রথমে বিষয়টিকে পারিবারিক বলে মন্তব্য না করলেও পরে দাবি করেন, দাফন করা কফিনে তার বাবা হেফাজ উদ্দিনের মরদেহই ছিল। আবু জাফর তমাল জানান, তিনি ওই রাতে উপস্থিত ছিলেন। এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, হেফাজ উদ্দিনের বাড়ির গার্ড সাইফুল জানান, পেটে ঘা হওয়ার পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়। ভারতে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান বলেও দাবি করেন সাইফুল।

হেফাজ উদ্দিনের সাবেক সহকর্মী ও তার বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মিন্টুও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। বরং তিনি প্রতিবেদককে হুমকিসূচক মন্তব্য করেন। পরে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা জামাত খান জানান, হেফাজ উদ্দিন অনেক বছর আগে মারা গেছেন এবং তিনি তার জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

ফলে একদিকে সরকারি নথিতে ২০২৬ সালের ১০ জুলাই কলকাতায় মৃত্যু, অন্যদিকে স্বজন-পরিচিতদের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০২৩ সালের মৃত্যুর তথ্য—দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুসনদ, কলকাতার মনিপাল হাসপাতালের চিকিৎসা ও মৃত্যুসংক্রান্ত নথি, মরদেহ দেশে আনার কাগজপত্র, অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য, সিটি করপোরেশনের দাফন-সংক্রান্ত ফর্ম এবং টিকাপাড়া গোরস্থানের রেজিস্টার যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্তকরণেরও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

কারণ, ২০২৩ সালে মারা যাওয়ার তথ্য থাকা হেফাজ উদ্দিনের নামে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে টিকাপাড়া গোরস্থানে যে মরদেহ দাফন করা হয়েছে, সেটি আসলে কার—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।