শীত আসার আগেই মাঠে আগাম সবজি, লাভের আশায় রাজশাহীর কৃষক

Farmers of Rajshahi hoping for profit
আবুল কালাম আজাদ , রাজশাহী:- ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১৮ পূর্বাহ্ন কৃষি
আবুল কালাম আজাদ , রাজশাহী:- ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
শীত আসার আগেই মাঠে আগাম সবজি, লাভের আশায় রাজশাহীর কৃষক
শীত আসার আগেই মাঠে আগাম সবজি, লাভের আশায় রাজশাহীর কৃষক

শীতের সবজির স্বাভাবিক মৌসুম শুরু হতে এখনো প্রায় দুই মাস বাকি। এরই মধ্যে রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন মাঠে আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ নানা সবজির আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। 

মৌসুমের শুরুতে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রির আশায় আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি নিচ্ছেন তাঁরা। তবে বাড়তি লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি অতিবৃষ্টি, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারদর কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের আশগ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেন এবার ৩২ বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। গত মৌসুমে আগাম সবজি চাষ করে লাভবান হওয়ায় এবার আবাদ বাড়িয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে সাড়ে ৭ বিঘা জমির কপি বিক্রি করেছেন। তাঁর হিসাবে, উৎপাদন, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে আশগ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির পরিচর্যায় ব্যস্ত মোশাররফ। গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া, সার প্রয়োগ ও আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন তিনি।

মোশাররফ হোসেন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শে আগাম জাতের কপি চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় প্রায় ৬ হাজার পিস কপি রোপণ করেছেন। এতে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। তবে আগাম সবজি চাষে কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতি বিঘায় প্রায় ২ হাজার কপি নষ্ট হয়। তারপরও সময়মতো বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। গত বছর ভালো লাভ হয়েছিল। তাই এবার আবাদ বাড়িয়েছি।’

মোশাররফ জানান, চলতি মৌসুমে তিন বিঘা ফুলকপি এবং সাড়ে চার বিঘা বাঁধাকপি বিক্রি করেছেন। প্রতি পিস কপি ৫০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো সময় সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েছেন। তাঁর আরও প্রায় ২৫ বিঘা জমির কপি আগামী কয়েক দফায় বাজারজাত করার উপযোগী হবে। বাজারদর ভালো থাকলে এবারও উল্লেখযোগ্য লাভের প্রত্যাশা করছেন তিনি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগাম সবজির মূল সুবিধা হচ্ছে—স্বাভাবিক মৌসুমের আগে বাজারে ওঠায় তখন প্রতিযোগী সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে একই সবজি মৌসুমের তুলনায় বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ সুবিধা ধরে রাখতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। কয়েক দিন দেরি হলেও বাজারে একসঙ্গে বেশি সবজি উঠলে দাম দ্রুত কমে যেতে পারে।

পবার আলিমগঞ্জ এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার ১২ কাঠা জমিতে প্রায় ৪ হাজার পিস আগাম বাঁধাকপি চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে ২০০ পিস বাঁধাকপি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারদর ধরে বাকি কপিগুলো বিক্রি করতে পারলে প্রায় এক লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি। সে হিসাবে খরচ বাদে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভের 

প্রত্যাশা করছেন এই কৃষক।

নজরুল ইসলাম গত বছর পাঁচ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভ করেছিলেন। এবার কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১০ কাঠা জমিতে আগাম জাতের টমেটো চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে গাছে ফুল এসেছে। আশ্বিনের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম দফায় টমেটো বাজারজাত করার আশা করছেন তিনি।

নজরুল বলেন, ‘আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে দাম বেশি পাওয়া যায়। তবে রোগবালাই বা আবহাওয়ার কারণে ফলন কমে গেলে লোকসানের আশঙ্কাও থাকে। তাই লাভের পাশাপাশি ঝুঁকিও হিসাব করে চাষ করতে হয়।’

পবা উপজেলার হরিপুর, হরিয়ান, দামকুড়া, পারিলা, বড়গাছী, নওহাটা ও পাইকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এবার আগাম সবজির আবাদ হয়েছে। এসব এলাকায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শিম, মুলা, গাজর, বেগুন, করলা, কাকরোল, লাউ, লালশাক ও ধনেপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা।

নওহাটা পৌরসভার পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান এবার দেড় বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে সবজি বাজারে তুলতে পারব বলে আশা করছি। বাজারদর ভালো থাকলে আগাম চাষে লাভও ভালো হবে।’

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ:-

পবা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি, ইতোমধ্যে ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশে আগাম জাতের সবজি চাষ হচ্ছে।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান বলেন, বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য বিবেচনা করে কৃষকেরা ফসল নির্বাচন করছেন। আগাম সবজি চাষে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে অনুমোদিত মাত্রা মেনে চলার বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।তিনি বলেন, ‘আগে কৃষি ছিল বাঁচার জন্য। এখন কৃষি হচ্ছে ব্যবসার জন্য।’

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম সবজি চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি হলেও এটি তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার ওঠানামা, রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং বাজারদরের অনিশ্চয়তা—সবকিছুই কৃষকের লাভ-লোকসানের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে আগাম জাত নির্বাচন, সময়মতো পরিচর্যা এবং বাজারজাতকরণের ওপর সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।

শীতকালীন সবজির স্বাভাবিক মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই সময়ের আগেই বাজার ধরতে পারলে কৃষক বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ পান। তাই বাড়তি আয়ের আশায় পবার অনেক কৃষক এখন প্রচলিত মৌসুমের অপেক্ষা না করে আগাম সবজি উৎপাদনে ঝুঁকছেন। তবে এই চাষে লাভ ধরে রাখতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।