নড়বড়ে রেললাইনেই উচ্চগতির ট্রেনের স্বপ্ন ॥ পূর্ব-পশ্চিম দুই অঞ্চলে ট্র্যাকের দুরবস্থা

The dream of a high-speed train lies on a shaky railway line
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিবেদক:- ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১৭ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিবেদক:- ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১৭ অপরাহ্ন
নড়বড়ে রেললাইনেই উচ্চগতির ট্রেনের স্বপ্ন ॥ পূর্ব-পশ্চিম দুই অঞ্চলে ট্র্যাকের দুরবস্থা
--সংগৃহীত ছবি

দেশের রেলপথে আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগ চলছে। কোথাও ডাবল লাইন, কোথাও বিদ্যুৎচালিত ট্রেন, আবার কোথাও উচ্চগতির রেল চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে দেশের বিদ্যমান রেলপথের একটি বড় অংশ এখনো পুরোনো রেল, ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার, পর্যাপ্ত ব্যালাস্টের ঘাটতি, ট্র্যাকের ত্রুটি এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণ সংকটে ভুগছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিশ্চিত না করে উচ্চগতির ট্রেনের স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম মূলত পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই দুই জোনে বিভক্ত। দুই অঞ্চলের পৃথক ট্রেনসূচি ও অবকাঠামো রয়েছে।

রেলের দুই অঞ্চলের চিত্রই উদ্বেগজনক:-

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রেলওয়ের সংস্কার-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, রেলপথের কিছু অংশে রেল ও ট্র্যাকের অবক্ষয় গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেশির ভাগ রেল লাইনের অবক্ষয়ের হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে; এর সঙ্গে ট্র্যাক ফাটল ও ওয়েল্ডিং-সংক্রান্ত সমস্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার প্রায় ২,০২৮ কোটি টাকার রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্প নিয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো একটি লাইন বা একটি অঞ্চলের নয়; পুরোনো অবকাঠামো পুনর্বাসন এখন রেলওয়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

পশ্চিমাঞ্চলেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে বগুড়ার আদমদীঘিতে নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ার পর প্রায় ২২ ঘণ্টা পর ওই পথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আবার ২০২৬ সালের জুনে পরপর দুটি লাইনচ্যুতির ঘটনায় ট্র্যাকের অবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। একটি প্রতিবেদনে ঢাকা-জামালপুর রুটসহ সংশ্লিষ্ট রেলপথের অবস্থা নিয়ে ঝুঁকির কথা উঠে আসে।

শুধু লাইন নয়, সক্ষমতার সংকটও বড়:-

রেললাইনের মানের পাশাপাশি দেশের অনেক রেলপথের সক্ষমতাও সীমিত। অতীতে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী করিডোরে ট্র্যাকের সক্ষমতার তুলনায় বেশি ট্রেন পরিচালনার কারণে সময়সূচিতে দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়টি উঠে এসেছিল। ওই ১৭৪ কিলোমিটার সিঙ্গেল-ট্র্যাক অংশে দৈনিক ২২টি ট্রেন স্বাভাবিকভাবে চালানোর সক্ষমতা থাকলেও ৪২টি ট্রেন চলাচলের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

এর অর্থ, রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বলতে শুধু নতুন ট্রেন কেনা নয়; ট্র্যাকের ধারণক্ষমতা, ডাবল লাইন, সিগন্যালিং, সেতু, স্টেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও একই সঙ্গে আধুনিক করতে হবে।

পূর্বাঞ্চলেও দুর্ঘটনার বাস্তবতা:-

পূর্বাঞ্চলের রেলপথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ২০২৬ সালের মার্চে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনার সময় ওই লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান ছিল না বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল।

অবশ্য লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা সরাসরি রেললাইনের ত্রুটির প্রমাণ নয়। কিন্তু এটি রেল নিরাপত্তার সামগ্রিক দুর্বলতার একটি দিক তুলে ধরে—ট্র্যাক, লেভেল ক্রসিং, সিগন্যালিং, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুকেই একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

উচ্চগতির ট্রেন কতটা বাস্তবতা:-

বাংলাদেশে উচ্চগতির রেল নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে উচ্চগতির রেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নিয়ে আগেও কাজ হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন, ডাবল ট্র্যাক এবং মূলত উড়াল/নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামোর কথা ছিল।

তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা তখনই প্রশ্ন তুলেছিলেন—যে দেশে বিদ্যমান রেল ব্যবস্থায় ১০০ কিলোমিটার গতিতেও পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই, সেখানে সরাসরি ৩০০ কিলোমিটার গতির ট্রেনে যাওয়ার আগে ধাপে ধাপে অবকাঠামো উন্নয়ন করা উচিত।সাম্প্রতিক সময়েও বিদ্যুৎচালিত ও উচ্চগতির ট্রেন নিয়ে উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে।

এখানেই মূল প্রশ্ন—উচ্চগতির ট্রেনের আগে উচ্চগতির উপযোগী রেলপথ তৈরি হয়েছে কি?

সাধারণত রেলপথে ব্যবহৃত ট্র্যাককে শুধু দ্রুতগতির ট্রেন এনে উচ্চগতির রেলপথে পরিণত করা যায় না। প্রয়োজন বিশেষ মানের ট্র্যাক, শক্তিশালী ট্র্যাকবেড, নির্ভুল অ্যালাইনমেন্ট, উন্নত সিগন্যালিং, নিয়ন্ত্রিত লেভেল ক্রসিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।

আগে ট্র্যাক, পরে গতি:-

রেলওয়ের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি।প্রথম ধাপে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন চিহ্নিত করে পুরোনো রেল ও স্লিপার প্রতিস্থাপন, পর্যাপ্ত ব্যালাস্ট নিশ্চিত করা, দুর্বল ট্র্যাকবেড মেরামত, রেল ওয়েল্ডিং পরীক্ষা, সেতু ও কালভার্টের সক্ষমতা যাচাই এবং নিয়মিত ট্র্যাক পরিদর্শন জোরদার করা দরকার।

এরপর প্রয়োজন যেখানে একক লাইন রয়েছে সেখানে সক্ষমতা অনুযায়ী ডাবল লাইন নির্মাণ, আধুনিক সিগন্যালিং ও স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং নির্মূল করা।তারপরই উচ্চগতির রেল নিয়ে বড় বিনিয়োগের প্রশ্ন আসা উচিত।কারণ নড়বড়ে ট্র্যাকে গতি বাড়ানো আধুনিকায়ন নয়; বরং ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হতে পারে।

রেলযাত্রীদের প্রত্যাশা নিরাপদ যাত্রা:

দেশের মানুষ দ্রুতগতির ট্রেন চায়। আধুনিক রেল চায়। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু সবার আগে তারা চায় নিরাপদে বাড়ি ফিরতে।

তাই রেলওয়ের উন্নয়নের সঠিক দর্শন হতে পারে—

“আগে নিরাপদ রেললাইন, তারপর দ্রুতগতির ট্রেন।”

পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ :-

ট্র্যাকগুলোকে আধুনিক মানে উন্নীত না করে শুধু উচ্চগতির ট্রেনের স্বপ্ন দেখলে তা বাস্তবায়নের চেয়ে প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকবে।

দেশের রেল ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক করতে হলে আগে রেললাইনের বেহাল দশা দূর করতে হবে। নতুন রেললাইন যেখানে প্রয়োজন সেখানে নির্মাণ করতে হবে। বিদ্যমান লাইনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এরপরই উচ্চগতির রেল চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

কারণ রেলের আধুনিকতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ট্রেন কত দ্রুত চলে তা নয়—যাত্রী কতটা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছান, সেটিই আসল।