সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে একি ব্যাক্তির দুইবার দাফন, লাশ নিয়ে ধুম্রজাল
রাজশাহীর টিকাপাড়া গোরস্থানে একটি লাশ দাফন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সাড়ে তিন বছর আগে যিনি মারা গেছেন বলে সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা জানেন, তাকে আবার দাফন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই নামে কাকে দাফন করা হয়েছে? এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
কাগজপত্রে মৃত ব্যক্তির নাম হেফাজ উদ্দিন।
তবে তার স্বজন, প্রতিবেশী ও সাবেক সহকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। তার ছেলে মো. আসকার-ইবনে-সায়িখ তনয় জানিয়েছেন, বাবা হেফাজ উদ্দিন ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার ধানমন্ডিতে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন মারা যান তিনি। ওই বছরের ১৮ মার্চ তাকে গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে দাফন করা হয়।
তাহলে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাফন করা লাশটি কার?-এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুলাই রাত ২টা ১০ মিনিটে রাজশাহী মহানগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে। মধ্যরাতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি দামি গাড়ি গোরস্থানের সামনে এসে থামে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে কফিন নামিয়ে কয়েকজন গোরস্থানের ভিতরে প্রবেশ করেন।
এ সময় সেখানে ছিলেন নৈশপ্রহরী করিম ও স্থানীয় চায়ের দোকানি সিকান্দার আলী।
সিকান্দার আলী জানান, এতো রাতে দাফনের বিষয়ে জানতে চাইলে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা জানান, লাশটি ভারতের কলকাতা থেকে এসেছে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ব্যক্তি মারা যান। পথে দেরি হওয়ায় রাতে দাফন করতে হচ্ছে। তার দাবি, অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি গাড়িতে মোট চারজন ছিলেন।
গোরস্থানের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, বাদশা নামে এক ব্যক্তি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কবর খুঁড়ছেন।
কবর খোঁড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাদশা বলেন, তিনি বিষয়টি বিস্তারিত জানেন না। তাকে কবর খুঁড়তে বলা হয়েছে, তাই তিনি কবর খুঁড়েছেন। এর আগেও আরও দুটি কবর খোঁড়া হয়েছিল, কিন্তু সেদিন লাশ আসেনি।
পরে গোরস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বারেক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, লাশটি ভারতের কলকাতা থেকে আসার কথা ছিল। তার তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা রিপনের ভাই সুলতানাবাদ জামে মসজিদের পানির পাম্পচালক মামুন এবং তার জামাই তমাল কয়েকদিন আগে এসে একটি লাশ দাফনের জন্য কবর প্রস্তুতের অনুরোধ করেন। বারেক জানান, প্রথমে নির্ধারিত সময়ে লাশ না আসায় কবর খোঁড়ার কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরে ২৭ জুলাই রাতে লাশ আসবে বলে জানানো হলে পুনরায় কবর খোঁড়া হয়। শেষ পর্যন্ত রাত ২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে গোরস্থানে পৌঁছায়।
সিকান্দার আরও জানান, দাফনের সময় তিনি কফিন ধরে সহযোগিতা করেন এবং মাটি দেন। তবে লাশের সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের কেউ কফিনে হাত দেননি, মাটিও দেননি কিংবা কোনো দোয়া পড়তেও দেখা যায়নি। বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ঘটনার পর গোরস্থান কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দাফন করা লাশের পরিচয় হিসেবে হেফাজ উদ্দিনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সনদ জমা দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্মে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ এবং মৃত্যুর স্থান হিসেবে ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতাল উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার ছেলে তৌফিক তানভীর এবং আবু জাফর তমালকে ‘নাতি’ হিসেবে শনাক্তকারী উল্লেখ করা হয়েছে।
তৌফিক তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘এটা আমাদের পারিবারিক বিষয়। আপনাকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে আমি বাধ্য নই। ’ অন্যদিকে, তথ্য ফর্মে শনাক্তকারী হিসেবে উল্লেখ থাকা আবু জাফর তমাল বলেন, তিনি ওই রাতে উপস্থিত ছিলেন এবং তৌফিক তানভীর তার বন্ধু। এর বাইরে তিনি আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।
কাগজপত্রে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ উল্লেখ থাকলেও তার এনআইডিতে থাকা ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য। রাজশাহী উপশহরে তার বাড়ির গার্ড সাইফুল জানান, হেফাজ উদ্দিন প্রায় তিন-চার বছর আগে মারা গেছেন। তার পেটে ঘা হয়েছিল। ঢাকায় চিকিৎসা চলছিল এবং পরে তাকে ভারতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান। সাইফুল জানান, হেফাজ উদ্দিনের স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও জামাই ঢাকায় থাকেন। হেফাজ উদ্দিনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বরও তিনি দেন, যা বর্তমানে তার স্ত্রী ব্যবহার করেন। তবে ওই নম্বরে পরপর দুই দিন একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ কল রিসিভ করেননি।
হেফাজ উদ্দিনের একাধিক প্রতিবেশী ও স্থানীয় দোকানদারও জানান, তিনি আনুমানিক চার থেকে পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকর্মী এবং রাজশাহীতে তার বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা চাচাতো ভাই মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মিন্টু এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে আপনার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার জামাত খান বলেন, ‘হেফাজ উদ্দিনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। অনেকদিন আগে তিনি মারা গেছেন। আমি তার জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। ’
হেফাজ উদ্দিন রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি মারা যান বলে তার সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-যদি হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু ২০২৩ সালে হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তার নামে ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতাল থেকে লাশ আসার তথ্য কীভাবে সরকারি তথ্য ফর্মে এলো? আর যদি ২০২৬ সালের ১০ জুলাই হেফাজ উদ্দিন সত্যিই কলকাতার মনিপাল হাসপাতালে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে প্রতিবেশী, বাড়ির গার্ড ও সাবেক সহকর্মীরা কয়েক বছর আগেই তার মৃত্যুর কথা বলছেন কেন?
ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হলো-লাশ বহনকারী কফিনটির আকৃতি নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যেও সন্দেহ তৈরি হয়। চায়ের দোকানি সিকান্দার আলী জানান, কফিনটি অনেকটা চা পাতার বাক্স বা মুরগির বাক্সের মতো দেখতে ছিল। মাঝেমধ্যে ফাঁকা অংশ দিয়ে সাদা কাফনের কাপড় দেখা যাচ্ছিল। দাফনের সময় লাশের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণও তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। কেউ কফিনে হাত দেননি, মাটিও দেননি কিংবা দোয়া করেননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পিয়ার জাহান জানান, প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে হেফাজ উদ্দিন মারা গেছেন। তার জানাজাতে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। তাকে দাফন করা হয় ভোলাহাটে। হঠাৎ করে শুনছেন হেফাজ উদ্দিনের লাশ তার ছেলেরা কবর থেকে তুলে রাজশাহীতে নিয়ে গেছেন।
সিটি করপোরেশনের মৃত্যু রেজিস্টার, টিকাপাড়া গোরস্থানে দেওয়া কাগজপত্রে আবার সেটি মিলছে না। সেখানে ভারতের মনিপাল হাসপাতালের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে দাফন করা হয়েছে। বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হয় হেফাজ উদ্দিনের ছেলে তৌফিক তানভীরের সঙ্গে। তিনি সাংবাদিক সম্পর্কে নানা কটূক্তি করেন। এরপর ইঙ্গিতে টাকা দেওয়ার কথা বলেন। শেষে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, কফিনে তার বাবা হেফাজ উদ্দিনের লাশই ছিল।