রেললাইনের ‘ইয়েতি’—বিকট শব্দে চালককে সতর্ক করে যে ছোট্ট সরঞ্জাম

The 'Yeti' of the railway line—a small device that warns the driver with a loud noise
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩২ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩২ অপরাহ্ন
রেললাইনের ‘ইয়েতি’—বিকট শব্দে চালককে সতর্ক করে যে ছোট্ট সরঞ্জাম
রেললাইনের ‘ইয়েতি’—বিকট শব্দে চালককে সতর্ক করে যে ছোট্ট সরঞ্জাম

রেললাইনের ওপর ছোট্ট একটি ধাতব বস্তু। দূর থেকে দেখতে অনেকটা পটকার মতো। ট্রেনের চাকা সেটির ওপর দিয়ে গেলেই মুহূর্তে সৃষ্টি হয় বিকট শব্দ। রেলওয়ের ভাষায় এর নাম ডিটোনেটর (Detonator) বা ফগ সিগন্যাল (Fog Signal)। কোথাও কোথাও এটি স্থানীয়ভাবে ‘ইয়েতি’ বা ‘পটকা’ নামেও পরিচিত।

দেখতে ক্ষুদ্র হলেও রেলপথের নিরাপত্তায় এর গুরুত্ব অনেক। এটি কোনো সাধারণ বোমা নয়; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ট্রেনের চালককে শব্দের মাধ্যমে সতর্ক করার জন্য তৈরি বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম। ভারতীয় রেলওয়ের সরকারি নিরাপত্তা বিধিতেও ডিটোনেটরকে এমন একটি সরঞ্জাম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা রেললাইনে স্থাপন করা হলে ট্রেন বা ইঞ্জিন এর ওপর দিয়ে অতিক্রমের সময় বিকট শব্দ সৃষ্টি করে চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ডিটোনেটর সাধারণত রেললাইনের ওপর নির্দিষ্ট নিয়মে স্থাপন করা হয়। ট্রেনের চাকা সেটির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সরঞ্জামটি বিস্ফোরিত হয়ে উচ্চ শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ চালকের কাছে একটি সতর্কতামূলক সংকেত হিসেবে পৌঁছে যায়।

অর্থাৎ, চালক সরাসরি সামনে কোনো সংকেত দেখতে না পেলেও শব্দের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে রেলপথে বিশেষ সতর্কতার পরিস্থিতি রয়েছে। এ কারণেই ডিটোনেটরকে দৃশ্যমান সংকেতের পাশাপাশি শ্রুতিসংকেত হিসেবেও দেখা হয়।

ঘন কুয়াশা, ঝড় বা অন্য কোনো কারণে দৃশ্যমানতা কমে গেলে ট্রেন চালকের জন্য সামনের সংকেত, ট্র্যাকের অবস্থা বা নির্দিষ্ট স্থানের অবস্থান বুঝতে সমস্যা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শব্দভিত্তিক সতর্কসংকেত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রেলওয়ের বিধিতে ঘন কুয়াশা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় দৃশ্যমানতা ব্যাহত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিটোনেটর ব্যবহারের বিধান রয়েছে। সরকারি নিয়মে বিশেষ ক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্বে একাধিক ডিটোনেটর স্থাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিটোনেটর ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ট্রেনের চালককে সামনে থাকা অস্বাভাবিক বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা। বিশেষ করে—

ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে গেলে,রেললাইনে জরুরি কাজ বা মেরামত চললে;

ট্র্যাকের কোনো অংশে সাময়িক সতর্কতা প্রয়োজন হলে,

রেলপথে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে,প্রচলিত সংকেতের পাশাপাশি চালকের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজন হলে—নির্ধারিত বিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত রেলকর্মীর মাধ্যমে এ ধরনের সতর্কসংকেত ব্যবহার করা হতে পারে।

ডিটোনেটর দেখতে অনেকটা ছোট পটকার মতো হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এটিকে ‘পটকা বোমা’ বলার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত সরঞ্জাম।

এর মূল উদ্দেশ্য ক্ষতি করা নয়; বরং শব্দ তৈরি করে ট্রেনের চালকের মনোযোগ আকর্ষণ করা। ফলে রেললাইনের পাশে পড়ে থাকা এমন কোনো বস্তু দেখলেই সেটিকে বোমা বা পরিত্যক্ত ধাতব বস্তু ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কৌতূহলবশত সেটি হাতে নেওয়া বা পরীক্ষা করাও নিরাপদ নয়।

ডিটোনেটর রেলওয়ের নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। এর ব্যবহার, সংরক্ষণ, পরীক্ষা ও নষ্ট করার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে। সরকারি রেলওয়ে নথিতে সময়োত্তীর্ণ ডিটোনেটর নিরাপদ পদ্ধতিতে ধ্বংস করার নির্দেশনা রয়েছে এবং এমনভাবে ফেলে না রাখার কথাও বলা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সেগুলো উদ্ধার করতে পারে।

এমনকি ডিটোনেটর পরীক্ষার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণের বিধান রয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় পরীক্ষার সময় সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট নিরাপদ দূরত্বে রাখার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

রেলপথে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু ইঞ্জিন, সিগন্যাল বা ট্র্যাকই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য ছোট ছোট নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ডিটোনেটর তারই একটি উদাহরণ।

আধুনিক রেল যোগাযোগব্যবস্থায় নানা ধরনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংকেত ব্যবহৃত হলেও জরুরি পরিস্থিতিতে চালকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শব্দভিত্তিক সতর্কসংকেতের ধারণাটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। রেল নিরাপত্তার মূল দর্শনই হলো সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে শনাক্ত করে দুর্ঘটনার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

তাই রেললাইনের ওপর পড়ে থাকা ছোট্ট ‘পটকার মতো’ বস্তুটি নিছক কোনো ধাতব টুকরা নয়। সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং প্রশিক্ষিত রেলকর্মীর মাধ্যমে ব্যবহৃত হলে এই ক্ষুদ্র সরঞ্জামটিই হয়ে উঠতে পারে ট্রেনের চালকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কবার্তা।

সতর্কতা: রেললাইনে এমন কোনো ডিটোনেটর বা সন্দেহজনক সরঞ্জাম দেখা গেলে সাধারণ মানুষের সেটি স্পর্শ, সরানো, পরীক্ষা বা ব্যবহার করা উচিত নয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট রেলকর্মী বা কর্তৃপক্ষকে জানানোই নিরাপদ।