শিশুরা খেতে ডাকে, বাবা বলেন ‘আমি খেয়ে নিয়েছি’

Children call for food, father says, "I ate it."
অনলাইন ডেস্ক ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫৭ অপরাহ্ন বিশ্ব/আন্তর্জাতিক
অনলাইন ডেস্ক ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
শিশুরা খেতে ডাকে, বাবা বলেন ‘আমি খেয়ে নিয়েছি’
--সংগৃহীত ছবি

ইয়েমেনের ৪৬ বছর বয়সী শিক্ষক মোহাম্মদ সায়েদ। যুদ্ধ শুরুর পর তাকে তিন থেকে চারবার ঘর ছাড়তে হয়েছে। এখন স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে তাইজ শহরের একটি ছোট্ট ঘরে থাকেন তিনি। বছরের পর বছর বেতন পাননি। বাড়িভাড়াও এক বছরের বেশি সময় ধরে বকেয়া।


তার সন্তানেরা এখনো খাবারের সময় বাবাকে ডাক দেয়। ‘বাবা, এসো, খেতে এসো’—বলে তারা। কিন্তু অনেক সময় সায়েদ সন্তানদের বলেন, তিনি খেয়ে নিয়েছেন। অথচ বাস্তবে তখন তিনি না খেয়েই থাকেন।


সায়েদ বলেন, আমরা এখন আর দিনে তিনবেলা খাবার খাই না। কখনো দুই বেলা, কখনো এক বেলা খাবার জোটে।


নতুন লড়াইয়ে ঘরছাড়া আরও মানুষ

ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যেই নতুন করে সংঘাত বেড়েছে।


গত সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া নতুন লড়াইয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে বলে ইউনিসেফের হিসাবে উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে আনুমানিক ৭৩ হাজার শিশু। ফলে অনেক পরিবারকে খাবারের বেলায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।


ইয়েমেনের যুদ্ধের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণের মানচিত্রও বারবার বদলেছে। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটি কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। দেশটির উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে।


অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।


তাইজে নতুন করে সংঘাত

গত ৩ সেপ্টেম্বর তাইজের পশ্চিমে হুথি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের লড়াই শুরু হয়। কয়েকদিনের মধ্যে হুথি যোদ্ধারা মোখা এলাকায় প্রবেশ করে। এরপর তারা লোহিত সাগরের উপকূলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে খবরে বলা হয়েছে।


সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটও পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথিরা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরু থেকে নতুন করে সংঘাতের ঘটনায় ৮৩৮ জন নিহত ও ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। শুধু ২৬ সেপ্টেম্বরের আগের এক সপ্তাহেই ১৬৪ জন নিহত হয়েছেন।


ইউনিসেফের হিসাবে, ৩ সেপ্টেম্বরের পর অন্তত ১৫ শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৪ শিশু। আরও তিন শিশু নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।


‘আমরা সবকিছু ফেলে এসেছি’

তাইজের পশ্চিমে মাকবানাহ এলাকার জাগার থেকে পালিয়ে এসেছেন ২৫ বছর বয়সী রুক্কায়া সায়েদ। তার আট সন্তান। রকেট ও গোলাবর্ষণের মধ্যে পরিবার নিয়ে তাকে ঘর ছাড়তে হয়। সঙ্গে নেওয়ার মতো সময়ও ছিল না।


রুক্কায়ার কথায়, তারা ঘরবাড়ি, গাধা ও মুরগিসহ সবকিছু ফেলে এসেছেন। এখন তাইজ শহরের কাছে আল-শাকাদিফ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।


কিন্তু সেখানে কোনো ত্রাণ সংস্থা তাদের খাবার দেয়নি বলে জানান রুক্কায়া। স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় কোনোভাবে দিন কাটছে। আশ্রয়ের জন্য ত্রিপল কিনতে তাকে ধার করতে হয়েছে। বৃষ্টিতে সেই ত্রিপল ভিজে গেছে একাধিকবার।


খাবারের সঙ্গে নেই নিরাপদ পানিও

রুক্কায়ার সন্তানদের কয়েকজন অসুস্থ। তাদের ডায়রিয়া, সর্দি ও আমাশয় হয়েছে। কিন্তু নিরাপদ পানি নেই। আশ্রয়শিবিরে শৌচাগারও নেই। নারীদের রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে দূরে যেতে হয় বলে জানান তিনি।


শিশুদের চিকিৎসার জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় পানি, লবণ ও চিনি দিয়ে ঘরেই চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের কারণে আমাশয় ছড়াতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা তৈরি হলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।


১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটে

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইয়েমেনে ১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে। শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।


ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে পারে। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি শিশুর গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সংস্থাটির কর্মকর্তা লুইস ওয়াটারিজ বলেন, সংঘাত ও ক্ষুধা একে অপরকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধ মানুষের খাবারের সুযোগ কমিয়ে দেয়। আবার ক্ষুধার্ত শিশুরা সংঘাতের প্রভাবে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।


এক মাস ধরে ঘর নেই

২৩ বছর বয়সী এনাস আবদুল্লাহ আবদোও তিন সন্তানকে নিয়ে ঘর ছেড়েছেন। হাদরান থেকে পালানোর দ্বিতীয় দিন ছিল সংঘাতের শুরু।


গোলাবর্ষণ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তারা। গাড়ি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পায়ে হেঁটে পরিবার নিয়ে বের হন আবদো। সঙ্গে নিতে পারেননি রান্নার সরঞ্জাম, বিছানা, কম্বল কিংবা আলো জ্বালানোর ব্যাটারি।


এখন পাঁচটি পরিবারের প্রায় ১৫ জন একটি ছোট, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে থাকছেন। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরেই পানি পড়ে। ভিজে যায় শিশু ও তাদের কাপড়।


একটি ত্রাণ সংস্থা পরিবারটিকে ২ লাখ ৭০ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমান প্রায ২০ হাজার টাকা। সেই অর্থে গ্যাস সিলিন্ডার ও কয়েকটি কম্বলসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কেনা হয়েছে। তবে খাবার, বিছানা ও ওষুধের সংকট রয়ে গেছে।


যুদ্ধ থামলেও রয়ে যাবে ক্ষত

সংঘাতের কারণে শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। আবদোর পরিবারের পাঁচ-ছয়জন শিশু আগে স্কুলে যেত। ঘর ছাড়ার পর তাদের মধ্যে মাত্র তিন-চারজন আবার স্কুলে ফিরতে পেরেছে। অন্যরা স্কুলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনতে পারেনি।


আবদো আগের এক দফা সংঘাতে এক ভাইকে হারিয়েছেন। অসুস্থতায় হারিয়েছেন বাবা-মাকেও।


ইয়েমেনে চলমান সংঘাত তাই শুধু মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে খাবার, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি ও শিশুদের শিক্ষার ওপরও। দেশটির লাখো মানুষের জন্য যুদ্ধের অর্থ এখন প্রতিদিন খাবারের জন্য লড়াই।


সূত্র: আল-জাজিরা