বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেটিং ব্যবস্থা: অবকাঠামো রেলের-মুনাফা প্রাইভেটের

Bangladesh Railway ticketing system
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি :- ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৭ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি :- ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেটিং ব্যবস্থা: অবকাঠামো রেলের-মুনাফা প্রাইভেটের
--সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশাল অবকাঠামো, টিকিট বুকিং সহকারী, বিদ্যুৎ, কার্যালয় থেকে শুরু করে স্টেশন ব্যবস্থা—সবকিছুই পরিচালিত হয় সরকারের রাষ্ট্রীয় খরচে। অথচ টিকিট বিক্রির অন্যতম লাভজনক অংশ বা কমিশন তুলে নিচ্ছে বেসরকারি ইজারা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। 


দীর্ঘ ২১ বছর ‘সিএনএস বিডি’ (CNS BD) টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পালন করার পর, বর্তমানে সেই ইজারা ভোগ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম’ (Shohoz-Synesis-Vincen JV)। সামান্য একটি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে রেলের টিকেটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নীতিগত ও আর্থিক প্রশ্ন উঠছে।


রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, কম্পিউটারাইজড টিকেটিং ব্যবস্থার যাবতীয় স্টেশনভিত্তিক কাউন্টার ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন রেলের নিজস্ব স্টাফ বা বুকিং সহকারীরা। স্টেশনের বিদ্যুৎ, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, এসি, ইন্টারনেট লাইন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ সবই বহন করে রেলওয়ে।

অথচ যাত্রীদের সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করছে বেসরকারি টিকিটিং পার্টনার। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি টিকিটের সাথে যাত্রীদের থেকে সার্ভিস চার্জ (প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা বা ক্ষেত্রভেদে নির্ধারিত ফি) নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, টিকিট বিক্রি থেকে অর্জিত একটি বড় অংকের কমিশন ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পকেটে চলে যায়, যা নিজস্ব অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে হাতছাড়া করছে।


বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেটিং খাতের ইতিহাস বিতর্কমুক্ত নয়। অতীতের ‘সিএনএস বিডি’র সময় থেকে শুরু করে বর্তমানের ‘সহজ ডট কম’-এর সময়কাল পর্যন্ত ব্ল্যাক মার্কেটিং, সার্ভার ডাউন, টিকিট কমার্শিয়াল ব্লক করে রাখা এবং টাকা কেটে নেওয়ার পরও টিকিট না পাওয়ার অগণিত অভিযোগ উঠেছে। 

কাউন্টার ও অনলাইন টিকেটের সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে অসৎ চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আসছে বলে অভিযোগ রেলযাত্রীদের। বারবার ইজারাদার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন হলেও অ্যাপের মৌলিক সক্ষমতা বা কালোবাজারি প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধান আসেনি।


 নিজস্ব অ্যাপ ও সফটওয়্যার  তৈরি না করার নপথ্যে:-

একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা কেন শত শত কোটি টাকা খরচের পর একটি স্থায়ী নিজস্ব সার্ভার ও আইটি টিম গঠন করতে পারছে না, তার পেছনে মূলত কয়েকটি প্রধান কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা:

১. স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও কমিশন বাণিজ্য: রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একটি মহল এবং সুবিধাভোগী চক্র প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার প্রসেসিং ফি ও কমিশন থেকে ভাগ পায়। নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা হলে এই কমিশনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

২. দায়বদ্ধতা এড়ানোর প্রবণতা: নিজস্ব আইটি টিম ও ডেটা সেন্টার পরিচালনা করতে গেলে সার্ভার ডাউন বা কারচুপির সরাসরি দায়ভার রেলওয়ের ওপর পড়ে। আউটসোর্সিং বা ইজারা দিলে দায়িত্ব বেসরকারিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ হয়।

৩. প্রযুক্তিগত আমলাতন্ত্র ও সদিচ্ছার অভাব: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের মতো সরকারি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী টিকেটিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্পূর্ণ সম্ভব হলেও, সেই উদ্যোগ গ্রহণে নীতি নির্ধারকদের ধারাবাহিক অনীহা দেখা গেছে। 


নিজস্ব ব্যবস্থা থাকলে সাশ্রয় হতো যত:-

বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন।

বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি: কেবল সার্ভিস চার্জ ও কমিশন বাবদ বছরে ইজারাদারদের হাতে চলে যায় আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি। 

সফটওয়্যার তৈরির বাস্তব খরচ: বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব আইসিটি ডিভিশন, জাতীয় ডেটা সেন্টার (National Data Center) এবং বুয়েটের প্রকৌশলীদের সহায়তায় সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা এককালীন খরচে একটি বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক মানের টিকেটিং সফটওয়্যার, সার্ভার ও ক্লাউড অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। 

সাবস্ক্রিপশন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ: বার্ষিক সার্ভার মেইনটেন্যান্স ও সিকিউরিটি অডিটের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। 

হিসাব যা বলে: রেলওয়ে যদি নিজস্ব টিকেটিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলত, তবে প্রথম বছরই তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতো এবং পরবর্তী প্রতি বছর টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত সার্ভিস চার্জের পুরো কোটি কোটি টাকা সরাসরি সরকারের রাজস্ব খাত বা রেলের সার্বিক উন্নয়নে যোগ হতো।


জনগণের দাবি ও ভবিষ্যৎ করণীয়:-

রেলওয়ের মতো বিশাল জাতীয় সম্পদে একটি তৃতীয় পক্ষকে বসিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের এই সংস্কৃতি বন্ধের দাবি দিন দিন তীব্র হচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ডেটা সেন্টার স্থাপন ও 'রেল সেবা' অ্যাপকে কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল না রেখে নিজস্ব আইটি ক্যাডার বা টিমের অধীনে পরিচালনা করা সময়ের দাবি। এতে যেমন সাধারণ যাত্রীরা টিকেটের কালোবাজারি থেকে মুক্তি পাবেন, তেমনি বাঁচবে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।