দাম্পত্য কলহ নিরসনে সাহাবি যায়িদের (রা.) যে ঘটনা অনুসরণীয়

The incident of the Companion Zaid (RA) that is worth following in resolving marital disputes
অনলাইন ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫৩ অপরাহ্ন ধর্ম
অনলাইন ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫৩ অপরাহ্ন
দাম্পত্য কলহ নিরসনে সাহাবি যায়িদের (রা.) যে ঘটনা অনুসরণীয়
--সংগৃহীত ছবি

রাসুল (সা.)-এর প্রীতিভাজন ও পালকপুত্র ছিলেন সাহাবি যায়িদ ইবন হারিসা (রা.)। তার পিতার নাম ছিল হারিসা এবং মাতার নাম ছিল সুদা বিনতু সালাবা।


সুদা বিনতু সালাবা তার শিশু পুত্র যায়িদকে সংগে করে পিতৃ গোত্র বনী মানের কাছে যাওয়ার জন্য যাত্রা করলেন। পিতৃ-গোত্রে পৌঁছার আগেই একদিন রাতে বনী কায়নের লুটেরা দল তাদের তাবু আক্রমণ করে ধন সম্পদ, উট ইত্যাদি লুণ্ঠন এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এই বন্দী শিশুদের মধ্যে যায়িদ ইবনে হারিসাও ছিলেন।


যায়িদের বয়স তখন আট বছর। লুটেরা দল তাকে বিক্রির উদ্দেশ্যে মক্কার উকাজ মেলায় নিয়ে যায়। হাকীম ইবন হিযাম ইবন খুয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা ৪০০ দিরহামে তাকে কিনে নেন। তিনি মহানবীর (সা.) সহধর্মীনী হজরত খাদিজার (রা.) ভাতিজা ছিলেন। মক্কায় ফিরে ফুফু খাদিজাকে উপহার দিলেন ছোট্ট জায়েদ ইবনে হারিসাকে। 


ভাতিজার কাছ থেকে উপহার পাওয়া পাওয়া যায়িদ ইবনে হারিসাকে তিনি স্বামী মুহাম্মাদের জন্য উপঢৌকন দিলেন। সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস জায়েদ মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর তত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন।


এদিকে যায়িদ ইবনে হারিসার মা পুত্র শোকে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা ছেলের সন্ধান পেলেন। ছেলেকে নেওয়ার জন্য মক্কায় এলেন। মহানবীও (সা.) কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই যায়িদকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে রাজি হলেন। কিন্তু মহানবীর (সা.) স্নেহ-ভালোবাসায় আপ্লুত যায়িদ পারিবারে সঙ্গে না গিয়ে মহানবীর সঙ্গে থেকে যাওয়ার কথা জানাল পরিবারকে। যায়িদের এই সিদ্ধান্তের পর রাসুল (সা.) তাকে নিজের পুত্র হিসেবে ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন,


ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী! তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী ৷


সবাই তাকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করতো । অবশেষে আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবের- ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক’- এ আয়াত নাযিল করে ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করেন। 


এ ঘটনার মাত্র কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ (সা.) নবুওয়াত লাভ করেন। যায়িদ হলেন পুরুষ দাসদের মধ্যে প্রথম বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহর (সা) তত্বাবধায়ক ।


যায়িদ যেমন পিতা-মাতাকে ছেড়ে রাসূলকে (সা.) বেছে নেন, তেমনি রাসূলও (সা) তাকে গভীরভাবে ভালোবাসলেন এবং তাকে আপন সন্তান ও পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করে নেন। যায়িদ দূরে গেলে তিনি উৎকণ্ঠিত হতেন, ফিরে এলে উৎফুল্ল হতেন এবং এত আনন্দের সাথে তাকে গ্রহণ করতেন যে অন্য কারো সাক্ষাতের সময় তেমন দেখা যেত না। কোন এক অভিযান শেষে হজরত যায়িদ মদীনায় ফিরে এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন হযরত আয়িশা (রা)।


তিনি বলেন, যায়িদ ইবন হারিসা মদীনায় ফিরে এলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন আমার ঘরে। সে দরজার কড়া নাড়লো। রাসুল (সা.) প্রায় খালি গায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তখন তার দেহে নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া কিছু ছিল না। এ অবস্থায় কাপড় টানতে টানতে দরজার দিকে দৌঁড়ে গেলেন। তার সাথে গলাগলি করলেন ও চুমু খেলেন। আল্লাহর কসম, এর আগে বা পরে আর কখনও রাসূলুল্লাহকে (সা.) এমন খালিগায়ে আমি দেখিনি।'


রাসুলুল্লাহর (সা.) ফুফাতো বোন জয়নাব বিনতে জাহাশের (রা.) সঙ্গে যায়িদ ইবনে হারিসার (রা.) বিয়ে হয়। জয়নাব বিনতে জাহাশ ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত স্বাধীন কুরাইশ নারী। অপর দিকে যায়িদ জীবনের প্রথম দিকে কিছুদিন কৃতদাস ছিলেন। সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য দূর করতে এবং তাকওয়াকেই মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জয়নাব (রা.)-এর সঙ্গে যায়িদ (রা.)-এর বিয়ের ব্যবস্থা করেন মহানবী (সা.)।


বিয়ের পর তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। বিভিন্ন বর্ণনায় তাদের মধ্যে মতের অমিল ও দাম্পত্য অসামঞ্জস্যের কথা এসেছে। স্ত্রীর মনে বংশ-মর্যাদা ও আভিজাত্য বাসা বেঁধে ছিল, অন্য দিকে যায়িদের সমভ্রমে ছিল দাসত্বের দাগ। একপর্যায়ে যায়িদ (রা.) রাসুলুল্লাহর কাছে এসে স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ করেন এবং বিচ্ছেদের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে স্ত্রীকে রেখে দিতে এবং আল্লাহকে ভয় করতে বলেন।


তবে শেষ পর্যন্ত তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক টেকেনি। যায়িদ ইবনে হারিসা (রা.) জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.)-কে তালাক দেন। এরপর জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) রাসুলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনীন বা মুমিনদের জননী হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন।


এই বিয়ের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিয়তগত শিক্ষা ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে পালকপুত্রকে আপন পুত্রের মতো মনে করা হতো। ফলে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ এমন সামাজিক ধারণা ছিল। সুরা আহযাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয় এবং দেখানো হয় যে পালকপুত্র জৈবিক পুত্রের সমতুল্য নয়।


পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,


وَ اِذۡ تَقُوۡلُ لِلَّذِیۡۤ اَنۡعَمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ وَ اَنۡعَمۡتَ عَلَیۡهِ اَمۡسِكۡ عَلَیۡكَ زَوۡجَكَ وَ اتَّقِ اللّٰهَ وَ تُخۡفِیۡ فِیۡ نَفۡسِكَ مَا اللّٰهُ مُبۡدِیۡهِ وَ تَخۡشَی النَّاسَ ۚ وَ اللّٰهُ اَحَقُّ اَنۡ تَخۡشٰهُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیۡدٌ مِّنۡهَا وَطَرًا زَوَّجۡنٰكَهَا لِكَیۡ لَا یَكُوۡنَ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ حَرَجٌ فِیۡۤ اَزۡوَاجِ اَدۡعِیَآئِهِمۡ اِذَا قَضَوۡا مِنۡهُنَّ وَطَرًا ؕ وَ كَانَ اَمۡرُ اللّٰهِ مَفۡعُوۡلًا


আর স্মরণ কর, আল্লাহ যার উপর নিয়ামত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর’। আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে। (সুরা আহযাব, আয়াত: ৩৭)


সাহাবি যায়িদ ও তার স্ত্রী জয়নবের মধ্যে কলহ লেগেই থাকত। তিনি নবীজির কাছে দাম্পত্য বিচ্ছেদের আবেদন করেন। কিন্তু রাসুল (সা.) কোনোভাবে চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। 


এদিকে আল্লাহ তায়ালা নবীকে (সা.) ওহীর মাধ্যমে এই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছিলেন যে, যায়েদের পক্ষ থেকে তালাক হবে এবং তারপর জয়নাবের সাথে আপনার বিয়ে হবে; যাতে জাহেলিয়াতের পোষ্যপুত্র রাখার প্রথার উপর জোর কুঠারাঘাত হেনে প্রকাশ করে দেওয়া হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে পোষ্যপুত্র আপন পুত্রের মত নয় এবং তার তালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ। এই আয়াতে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।