ধর্মীয় মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীদের আপত্তি, রুয়েটের আইএপি থেকে সদস্য বাদ

Students object to religious comments
রুয়েট প্রতিনিধি: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:১৫ অপরাহ্ন সারা বাংলা
রুয়েট প্রতিনিধি: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:১৫ অপরাহ্ন
ধর্মীয় মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীদের আপত্তি, রুয়েটের আইএপি থেকে সদস্য বাদ

পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আপত্তি ও দাবির মুখে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের শিল্প-উপদেষ্টা প্যানেল (আইএপি) থেকে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আজ বিকেল ৩টায় ইসিই বিভাগের প্রধানের সভাপতিত্বে আইএপি প্যানেল থেকে একজন সদস্য বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে উপস্থিত সদস্যরা অনুমোদন করেছেন। তবে উক্ত সদস্যকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

উল্লেখ্য শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রুয়েট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (আরডিএফ) নামের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে বহিষ্কৃত ব্যক্তির কিছু মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। রুয়েটের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ইইই, ইসিই, ইটিই ও এমটিই বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গ্রুপটি গঠিত। যেখানে কুরআন কোর্স সংক্রান্ত একটি বার্তা ঘিরে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদের বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য উঠে আসে। যা ধর্মপ্রাণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্ম চর্চা ও ধর্মীয় মৌলিক অনুভূতিতে আঘাত করে বলে।

সেখানে সাইদ ইমতিয়াজ কোরআনকে ‘ইশারা গ্রন্থ' হিসেবে উল্লেখ করে বলেন রুয়েটের উচিত বিজ্ঞান বইয়ের পরিবর্তে ইশারা গ্রন্থ থেকে শিক্ষা দেওয়া। এছাড়াও তিনি কোরআন বিজ্ঞানের বই নয়, এটি নিদর্শনের বই হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রকৌশলীদের পণ্য নকশা ও নির্মাণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোরআনের জ্ঞান ব্যবহারের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। কোরআনে বিমান তৈরি, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা যন্ত্র তৈরির পদ্ধতি নিয়ে আয়াত নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি কোরআনে পণ্য নকশার কথা থাকলে গ্রন্থটির ঐশী গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতো, এমন বক্তব্যও দেন।

পাশাপাশি তিনি কোরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে বিব্রতকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তিনি বার্তায় লিখেছেন,"বাবার হাতে মাকে মার খেতে দেখে সন্তানদের কাঁদা উচিত নয়। কুরআনের ৪ নং সূরার ৩৪ নং আয়াতে পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীদের মারধর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।"

কুরআনের ৬৪ নং সূরার ১৪ নং আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন,"রুয়েট-এর স্নাতক ও শিক্ষার্থীদের সন্তানরা যখন এ আয়াত পড়বে, তখন তারা জানতে পারবে যে তারা এবং তাদের মায়েরা তাদের পিতার শত্রু। তাই, কুরআন পুরুষদেরকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে উপদেশ দেয়।"

এসব মন্তব্যকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন ইসিই বিভাগের ধর্মপ্রাণ মুসলিম শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য, ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ নিয়ে এমন বক্তব্যের কারণে তারা ক্ষুব্ধ এবং সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে আইএপি সদস্য হিসেবে মানতে সম্মত নন। তার বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে উপদেষ্টা প্যানেল থেকে তাকে অবিলম্বে বাদ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে বিভাগের কোনো কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত না রাখার দাবি জানান।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে একাডেমিক ও পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ জানান। শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, রুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বা বিভাগের শিক্ষক না হয়েও সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছিলেন। তার পরামর্শে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মৌলিক কোর্সের পরিবর্তে মাইক্রোকন্ট্রোলার ভিত্তিক কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স ‘ইলেকট্রনিক শপ প্র্যাকটিস’ এ এসটিএম৩২-সংক্রান্ত সেশন উপস্থিতির ওপর ২০ শতাংশ নম্বর রাখার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, থিসিসের পরিবর্তে প্রকল্প ভিত্তিক কাজকে প্রাধান্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার পরামর্শে। এসব প্রভাবের কারণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসিই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন,“ শিক্ষার্থীদের কিছু যৌক্তিক দাবি-দাওয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাডভাইজারি প্যানেলের একজন সদস্যের ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানায় এবং তাকে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। শিক্ষার্থীদের এই আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উক্ত প্যানেল থেকে অব্যাহতি দিয়েছি। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবির মধ্যে ল্যাব সংস্কার, প্রজেক্ট এবং ওয়ার্কশপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ল্যাব বা ওয়ার্কশপ বাধ্যতামূলক না করে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে তা ঐচ্ছিক করার বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। ডিপার্টমেন্টের সার্বিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অগ্রগতির জন্যই আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের যেকোনো যৌক্তিক ও ইতিবাচক দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসন সবসময় আন্তরিক।”

জানা যায়, সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৯৭৫ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী এবং কানাডাভিত্তিক সিগন্যাল স্ট্রিম ইনকরপোরেটেডের সভাপতি।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একজন বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি এবং বিভাগের পাঠ্যক্রমে তার হস্তক্ষেপ তাদের একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। সামগ্রিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে আজকের বিভাগীয় সভায় সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে আইএপি এর সদস্যপদ বাতিলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের দাবির বাস্তবায়ন বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।