রামেবির ভিসি’র পিএস’র স্ত্রীসহ পরিবারের ১৫ জনের চাকরি রামেবিতে

VC's PS's wife, 15 family members get jobs in Rameb
রাজশাহী প্রতিনিধি : ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৫০ অপরাহ্ন সারা বাংলা
রাজশাহী প্রতিনিধি : ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৫০ অপরাহ্ন
রামেবির ভিসি’র পিএস’র স্ত্রীসহ পরিবারের ১৫ জনের চাকরি রামেবিতে
--সংগৃহীত ছবি

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরে (ভিসি) ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেনের হাতে যেন আলাদিনের চেরাগ রয়েছে। তিনি রামেবিতে চাকরি পেয়েছেনই, সঙ্গে বউ, শ্যালক, চাচা, চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাইসহ আশে-পাশের সবমিলিয়ে অন্তত ১৫জনকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্ষমতার দাপটে স্বামীর ক্ষমতার দাপটে স্ত্রী শারমিন আক্তার মাসের পর মাস একসময় অফিস করতেন না। পরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মাঝে মাঝে এখন অফিস করেন। তবে নাজমুল হোসেনের দাপট এখনো কমেনি। সেকশন কর্মকর্তা দিয়ে চাকরি শুরু হওয়া নাজমুল এখন ভিসির এপিএস। তাঁর পদোন্নতিও হয়েছে রকেটগতিতে।

রামেবি সূত্র মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন কর্মকর্তা হিসেবে নাজমুল হোসেনের গ্রেড হলো ৯ম। কিন্তু তাঁকে সহকারী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানেই থেমে থাকেননি বর্তমান ভিসি জাওয়াদুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশে নয়-ছয় করার পাশাপাশি নাজমুলের সঙ্গে মিলে-মিশে চলতে তাঁকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। এই পদটি হলো ৫ম গ্রেডের। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ছাড়া কখনো তাঁর উচ্চতর গ্রেডে দায়িত্বে দেওয়া যায় না। কিন্তু চারটি ধাপ উপেক্ষা করে নাজমুলকে ৫ম গ্রেডের দায়িত্বে বসিয়েছেন ভিসি। একসময় এই নাজমুলকে সেকশন কর্মকর্তা থেকে সহকারী কলেজ পরিদর্শক হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র মতে, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) প্রতিষ্ঠার পরপরই ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সেকশন অফিসার পদে যোগদান করেন নাজমুল হোসেন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রামেবি প্রতিষ্ঠার পর তাঁর চাচা শরিফুল ইসলামকে ক্যাশিয়ার এবং চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক ড্রাইভার এবং নাজমুলের সহকর্মী মেহেদি হাসান ও রাসেল আলীকে ড্রাইভার পদে চাকরি পাইয়ে দেন। ড্রাইভার পদে তাঁর পছন্দের দু’প্রার্থীকে চাকরি দিতে ব্যবহারিক পরীক্ষার দিন রাতারাতি কমিটির সদস্য সচিবকে সরিয়ে দিয়ে নাজমুল নিজেই সদস্য সচিব হয়ে যান। ড্রাইভার মেহেদী হাসান ও রাসেলের চাকরির জন্য তিনি জনপ্রতি মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একই সময়ে নাজমুল তাঁর চাচাত ভাই মিজানুর রহমানকে গার্ডের অস্থায়ী পদে চাকরি পাইয়ে দেন। এর পর রামেবির দ্বিতীয় ভিসি প্রফেসর ডা. মোস্তাক হোসেনের আমলে স্ত্রী শারমিন আক্তার এবং দীন মোহাম্মদ চক্ষু হাসপাতালের তাঁর সাবেক সহকর্মী তানভীর হোসেনকে সেকশন অফিসার পদে চাকরি পাইয়ে দেন।

সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-আগস্ট পরবর্তী ভিসি ডা. জাওয়াদুল হকের আমলে রামেবিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন নাজমুল হোসেন। এই ভিসি নাজমুলকে নিয়মবর্হিভূতভাবে চলতি দায়িত্ব হিসেবে সহকারী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে বসান। এরপর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) করেন। পিএস হওয়ার পরপরই আউটসোর্সিং এর ছয় কর্মচারীকে চাকরিচ্যূত করে তাঁর শ্যালক মোরতুজাসহ ছয়জনকে চাকরি দেন নাজমুল। আউটসোর্সিং এসব চাকরির জন্য নাজমুল হোসেন ও তার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য স্টোরকিপার শামীম হোসেন জনপ্রতি পাঁচ-ছয় লাখ করে উৎকোচ নেন বলেও অভিযোগ আছে। নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে টাকা দেওয়া নিয়ে আলোচনার এই ধরনের একটি ভিডিও রেকর্ডও আছে কালের কণ্ঠের কাছে। এছাড়া তার ফুপাত ভাই মোঃ মাসুদ রানাকে প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং খালাত ভাই ও শ্যালক কাউসার আহমেদকে প্রজেক্টের অফিস সহায়ক পদে চাকরি পাইয়ে দেন নাজমুল।

প্রসঙ্গত, নাজমুল হোসেন ২০১৭ সালে রামেবিতে যোগদান করার পরে রামেবি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালেও চাকরি করতেন বলে অভিযোগ ছিল।  তবে নাজমুল হোসেনের  দাবি করেন তিনি দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেননি।

এছাড়াও ভিসির এপিএস হওয়ার সুবাদে নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে টেন্ডার সিন্ডিকেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ কেটে নেওয়া, বাগানের আম গোপনে বিক্রি করাসহ নানা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগ আছে।

নাজমুলের সম্পদ:-

সূত্র মতে, নাজমুল এবং তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার নূরের নামে ঢাকায় সাভারে বসিলা এলাকায় তার প্লট রয়েছে। রাজশাহী শহরের ডাবতলা এলাকায় ১২ তলা অপরাজিতা টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট কিনেন। যার নম্বর হলো ১২বি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমুল হোসেন বলেন, আমি ১৫ জন আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দিয়েছি বলে মনে হচ্ছে না। তবে যারা চাকরি পেয়েছেন যোগত্যানুযায়ী পেয়েছেন।’

ভিসির পিএস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার আগেও একই পদে থেকে দুজন এই পদে দায়িত্ব পালন করে গেছে। কারণ রামেবিতে প্রায় ২৭টি পদ শূন্য রয়েছে। যেসব অনুমোদিত ৮৮টি পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেখানে সর্বোচ্চ পদ হলো সেকশন কর্মকর্তা। বাকি সবগুলোই হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত, নয়ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।’

সম্পদ প্রসঙ্গে নাজমুল হোসেন বলেন, ‘ঢাকায় একটি প্লটের শেয়ার আছে। সেটি ২০২০ সালে কেনা। রাজশাহীতে ফ্ল্যাট কিনেছি, কিভাবে তার সমস্ত হিসেব আমার কাছে আছে। কোনো অনিয়মের অর্থে আমি কোনো অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেনি।’