১৩ই এপ্রিল: ১৯১৯ জালিয়ানওয়ালাবাগ ও ১৯৭১ সারদা গণহত্যা
একশ সাত বছর আগে, ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ তারিখে পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের ভেতর, দেয়ালঘেরা এক সাধারণ উদ্যান জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটেছিল নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। হলদে নরম আলোয় বৈশাখী-এর আনন্দ উদযাপনে মানুষজন ভিড় করেছিল এই উদ্যানে। কেউ হাতে ধরে ছিলেন শিশুর আঙুল, কারও মুখে ছিল উৎসবের হাসি। আবার কেউ কেউ এসেছিল প্রতিবাদ জানাতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের সোচ্চার কণ্ঠে স্লোগন তুলে ধরতে। তারা জানত না, সেই বিকেল তাদের জীবনের শেষ বিকেল হতে চলেছে।
হঠাৎই বাগানের সরু প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যায়। বন্দুকধারী সৈন্যরা ঢুকে পড়ে। তাদের নেতৃত্বে জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার, একটি শীতল, নির্দয় মুখ। কোনো সতর্কতা নেই, কোনো সময় দেওয়া হয়নি। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ বিদীর্ণ করে গর্জে ওঠে গুলির শব্দ। মানুষ ছুটতে থাকে, কিন্তু কোথায় যাবে? চারপাশে উঁচু দেয়াল। কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, কেউ আর্তনাদ করছে, কেউ সন্তানকে বুকে চেপে রেখেছে শেষ আশ্রয় হিসেবে। রক্তে ভিজে যায় মাটি, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে মৃত্যুর গন্ধে। বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে অনেকে ঝাঁপ দেয় পার্কের একটি কূপে, যেন মৃত্যুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে মুক্তি।
সন্ধ্যা নামে, কিন্তু সেই বাগানে আর কোনো আলো জ্বলে না, শুধু পড়ে থাকে নিথর দেহ, স্তব্ধ আর্তনাদ, আর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৩৭৯ জন, তবে ভারতীয় সূত্রে তা হাজারেরও বেশি বলে মনে করা হয়। এই ঘটনার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভারতজুড়ে। মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয় ক্ষোভ, অপমান, আর স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই নির্মমতার প্রতিবাদে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রাপ্ত ‘নাইট’ উপাধি পরিত্যাগ করেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি জানান:
"সম্মাননা যেখানে লজ্জার ভার হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে তা বহন করা অসম্মানের।"
কবির এই প্রতিবাদ ছিল নীরব, কিন্তু বজ্রের মতো শক্তিশালী, একজন কবির কলম হয়ে উঠেছিল একটি জাতির আত্মমর্যাদার কণ্ঠস্বর।
জালিয়ানওয়ালাবাগ আজ শুধু একটি স্থান নয়, এটি এক স্মৃতি—রক্তে লেখা, অশ্রুতে ভেজা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কখনোই বিনামূল্যে আসে না; এর মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর অগণিত অশ্রুর বিনিময়ে।
★১৯৭১ সালের এই একই দিনে ১৩ এপ্রিল, রাজশাহীর চারঘাট থানাপাড়া ও সারদা পুলিশ একাডেমি এলাকায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এক নৃশংস গণহত্যা চালায়। তাদের দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় পাকসেনারা শত শত নিরীহ গ্রামবাসীকে সারদা বাজারে এবং পদ্মা নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহতের অধিকাংশের মরদেহ নিকটস্থ পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে শহীদের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। তবে ধারণা করা হয় কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ সেদিন শহীদ হয়েছিলেন।
যে সকল পাকিস্তানি দালাল এবং তাদের সমর্থক ঘৃণ্য রাজাকার আলবদরের উত্তরসূরি পাকিস্তানি পিতাদের অপরাধ লঘু করে দেখাতে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনায় এক দিনে নিহত হয়েছিলেন কমপক্ষে ৩৭৯ জন থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার। আর বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে নয় মাস ধরে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের সহযোগী জামাতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের মিলিশিয়া বাহিনী রাজাকার আলবদর। পাকিস্তানি দালালেরা ত্রিশ লক্ষের হিসাবটা এবারে মিলিয়ে নিতে পারেন।
আজ শুধু একটি স্থান নয়, এটি এক স্মৃতি—রক্তে লেখা, অশ্রুতে ভেজা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কখনোই বিনামূল্যে আসে না; এর মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর অগণিত অশ্রুর বিনিময়ে।