টিউশনের টাকায় ফলবাগান

Beach Raihan Sakin
অনলাইন ডেস্ক ০৯ মে ২০২৬ ০১:৫০ অপরাহ্ন কৃষি
অনলাইন ডেস্ক ০৯ মে ২০২৬ ০১:৫০ অপরাহ্ন
টিউশনের টাকায় ফলবাগান
--সংগৃহীত ছবি

করোনা মহামারির সময়ে যখন অনেক তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন, তখন ভিন্ন এক স্বপ্ন বুনেছিলেন বরিশালের তরুণ সৈকত রায়হান সাকিন। টিউশনি করে জমানো অল্প কিছু টাকা আর শখ-এই দুইকে পুঁজি করে বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি ফলবাগান গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেই ছোট উদ্যোগই এখন পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় একটি নার্সারি ও ফল উদ্যানে। বর্তমানে সেখান থেকে বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।

বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের তিলক গ্রামের এই তরুণ উদ্যোক্তার বাগান এখন স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করা সেই বাগান আজ শুধু তার উপার্জনের পথই নয়, বরং অন্য তরুণদেরও কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে তার মায়ের কাঁধে। মায়ের সাহস ও সহযোগিতায় এগিয়ে চলেন সাকিন। তার এই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার যাত্রায় পাশে রয়েছেন মা ও ছোট ভাই সিহাব হাসান সান্নিন।

২০২৩ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেন সাকিন। পড়াশোনা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজ বাড়ির এক একর জমিতে গড়ে তোলেন নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগান। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৮০টিরও বেশি আমের জাত।

বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে নানা রঙ, আকার ও স্বাদের আমগাছ। কোথাও ঝুলছে লম্বা আকৃতির আম, কোথাও গোলাকার কিংবা চ্যাপ্টা আকৃতির। কিছু গাছের ফল লালচে, কিছু সবুজ, আবার কিছু হলুদাভ। প্রতিটি গাছ যেন আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তার সংগ্রহে থাকা বিদেশি ও উচ্চমূল্যের আমের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বানানা ম্যাংগো, চাকাপাত, সূর্যডিম, অস্টিন, বারি-৪, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, আমেরিকান পালমার, অ্যাম্বিশ, পুসা সুরিয়া ও অরুণিমা। প্রায় প্রতিটি গাছেই এখন আম ধরেছে।

এ ছাড়া দেশীয় জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, আশ্বিনা, মল্লিকা, কাটিমন, হারিভাঙ্গা, রানিপছন্দ, মোহনভোগ, দিলপসন্দ, কোহিতুর, সুরমা ফজলি ও বোম্বাই।

শুধু আম নয়, তার বাগানে রয়েছে আঠাবিহীন কাঁঠাল, লাল জামরুল, মাল্টা, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, আঙুর, আনার, কমলা ও আপেলসহ প্রায় ৭০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা। বিশেষভাবে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে তিন ফুট উচ্চতার গাছে ধরা আঠাবিহীন কাঁঠাল।

সাকিন জানান, তিনি শুধু নিজের বাগান নিয়েই কাজ করছেন না, বরং অন্যদেরও ফলচাষে উদ্বুদ্ধ করছেন। ইতোমধ্যে তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় ১০টির বেশি ফলবাগান গড়ে উঠেছে। অনেকেই তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে ছাদবাগানও তৈরি করেছেন।

তিনি বলেন, করোনা সময়ে টিউশনের টাকা দিয়ে শখের বসে ছোট্ট একটি বাগান করি। পরে ধীরে ধীরে সেটিকে বড় করি। আমের প্রতি আমার আলাদা ভালোবাসা কাজ করে। এখন বিভিন্ন এলাকার মানুষ আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে বাগান করছেন। পরিকল্পিতভাবে ফলবাগান করলে বছরে সহজেই ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় সম্ভব। 

তিনি আরও বলেন, বরিশালের মাটিতে বিদেশি ফলের চাষ সম্ভব-এটাই আমি প্রমাণ করতে চাই। সঠিক জাত নির্বাচন, ভালো চারা, পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে পারে।

স্থানীয়রা বলেন, সাকিনের বাগান এখন শুধু একটি নার্সারি নয়, বরং তরুণদের জন্য একটি জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে স্বপ্ন, পরিশ্রম ও ধৈর্যের সমন্বয়ে কীভাবে সফলতা অর্জন করা যায়, তার বাস্তব প্রমাণ মিলছে।

সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা উত্তম ভৌমিক বলেন, সাকিনের ফলবাগানের খোঁজ নিয়েছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। প্রয়োজন হলে আবারও গিয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে। আমরা সব উদ্যোক্তাকে পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকি। আমিও বাগানটি পরিদর্শনে যাব।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. মামুনুর রহমান বলেন, এ ধরনের উদ্যোক্তাদের আমরা সব ধরনের পরামর্শ, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং প্রয়োজন হলে কৃষিঋণ পেতে সহযোগিতা করি। সাকিনের বাগানের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।