মূল্যায়ন শেষে রাবির অ্যাসাইনমেন্ট খাতা সংরক্ষনের বদলে কেজি দরে বিক্রয়ের অভিযোগ

Allegations of selling at kilogram price instead of maintaining assignment ledger
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ৩০ জুলাই ২০২৬ ০৫:৩০ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ৩০ জুলাই ২০২৬ ০৫:৩০ অপরাহ্ন
মূল্যায়ন শেষে রাবির অ্যাসাইনমেন্ট খাতা সংরক্ষনের বদলে কেজি দরে বিক্রয়ের অভিযোগ
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অ্যাসাইনমেন্ট।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অ্যাসাইনমেন্ট। শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা সময় ব্যয় করে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও লেখালেখির মাধ্যমে এসব অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করে থাকে। কিন্তু মূল্যায়ন শেষে এসব খাতার বেশিরভাগই শেষ ঠিকানা হয়ে উঠছে ভাঙারির দোকান- সেখানে খাতাগুলো বিক্রি হয় কেজি দরে।


সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ৫০ থেকে ৬০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে থাকেন। দিনরাত পরিশ্রম করে এসব অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে হয়। পাশাপাশি এ-ফোর আকারের কাগজ কিনতেও একজন শিক্ষার্থীর মাসে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার পরই শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এরপর সেই অ্যাসাইনমেন্ট খাতার কী হয়, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানেন না।


শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি সেমিস্টারে বিভিন্ন কোর্সের জন্য শিক্ষার্থীদের একাধিক অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে খাতা পূরণ করেন। অনেক সময় একটি অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে।


তবে মূল্যায়ন শেষ হলে এসব খাতা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হয় না। অনেক বিভাগে জায়গার অভাব এবং সংরক্ষণের নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কিছুদিন পরই এসব খাতা আলাদা করে জমা করা হয়। পরে সেগুলো ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।


ভাঙারির দোকানিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মাঝেমধ্যে বড় পরিমাণে খাতা ও কাগজপত্র আসে। এগুলো সাধারণত কেজি দরে কেনা হয় এবং পরে পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কাগজের কারখানায় পাঠানো হয়।


মনিরুল নামের একজন শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমাদের ৫০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে দেওয়া হয়। আমরা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পরিশ্রম দিয়ে সেগুলো হাতে লিখি এবং সুন্দরভাবে স্পাইরাল বাঁধাই করে জমা দিই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সেই পরিশ্রমের ফসল আমাদের হাতে লেখা অ্যাসাইনমেন্টগুলো শেষ পর্যন্ত ভাঙারির ঝুড়িতে চলে যেতে দেখি।’


বিনোদপুর এলাকার ভাঙারির ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রতিবছরই অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার খাতা ও নানা ধরনের কাগজপত্র কেজি দরে বিক্রি করা হয়। আমরা সেগুলো অন্যান্য পুরোনো কাগজের মতোই কিনে থাকি। পরে এগুলো কাগজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়। এসব খাতা বা কাগজ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা থাকে না।


শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিষয়টিকে হতাশাজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একটি অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে যে সময় ও শ্রম দেওয়া হয়, মূল্যায়নের পর সেটির কোনো একাডেমিক সংরক্ষণ বা ডিজিটাল আর্কাইভ থাকলে তা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও শিক্ষার কাজে লাগতে পারত।

একটি অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে অনেক সময়, শ্রম ও গবেষণা জড়িত থাকে। তাই মূল্যায়ন শেষে খাতাগুলো সরাসরি ভাঙারিতে বিক্রি না করে প্রথমে শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরত দেওয়া উচিত। এতে তারা নিজেদের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে।


শিক্ষার্থীদের দাবি, ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে ডিজিটাল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হলে কাগজের অপচয় কমবে এবং অ্যাসাইনমেন্ট দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রতিটি বিভাগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অ্যাসাইনমেন্ট সংরক্ষণের নীতিমালা থাকা উচিত। এরপর প্রয়োজন না থাকলে শিক্ষার্থীদের সম্মতি নিয়ে পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) করা যেতে পারে।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, প্রতি কোর্সের কিছু মানসম্মত বা সেরা অ্যাসাইনমেন্ট বিভাগীয় আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হলে তা ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সহায়ক হবে এবং ভালো কাজ করার উৎসাহও বাড়াবে। যদি কোনো কারণে খাতা পুনর্ব্যবহারের জন্য বিক্রি করতেই হয়, তবে আগে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তাও বজায় থাকবে।


ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন, প্রতি বর্ষেই আমাদের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন বা ফিডব্যাক আমরা কখনোই পাই না। অনেক ক্ষেত্রে সিজিপি-এর ভিত্তিতে অ্যাসাইনমেন্টের নম্বর দেওয়া হয়। অথচ একটি অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করতে আমাদের সময়, শ্রম ও অর্থ-সবকিছুরই প্রয়োজন হয়।


তিনি আরও বলেন, মূল্যায়নের পর খাতাগুলো শিক্ষার্থীদের ফেরত না দিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আমাদের খাতায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও মন্তব্য লিখে ফিডব্যাক হিসেবে ফেরত দিলে তা শেখার জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতো। পাশাপাশি অ্যাসাইনমেন্টের খাতা বিক্রি না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো সংরক্ষণ করলে আরও ভালো হতো।


ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ্ গালিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমাদের ৫০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে দেওয়া হয়। আমরা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পরিশ্রম দিয়ে সেগুলো হাতে লিখি এবং সুন্দরভাবে স্পাইরাল বাঁধাই করে জমা দিই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সেই পরিশ্রমের ফসল আমাদের হাতে লেখা অ্যাসাইনমেন্টগুলো শেষ পর্যন্ত ভাঙারির ঝুড়িতে চলে যেতে দেখি।

তিনি আরও বলেন, বিভাগ চাইলে জমা দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টগুলোর মধ্যে থেকে মানসম্মত ও ভালোভাবে উপস্থাপিত লেখাগুলো নির্বাচন করে বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমেরও যথাযথ মূল্যায়ন হবে।


এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে কাগজভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্টের পরিবর্তে ধীরে ধীরে ডিজিটাল সাবমিশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে কাগজের অপচয় কমবে এবং শিক্ষার্থীদের কাজও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো যদি অ্যাসাইনমেন্ট সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করে, তবে শিক্ষার্থীদের শ্রমের মূল্য আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করলেও অনেক শিক্ষক সেগুলো যথাযথভাবে পড়েন না, গঠনমূলক মন্তব্যও দেন না। মূল্যায়ন শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে খাতা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ভাঙারিতে বিক্রি করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের প্রতি অবমূল্যায়নই নয়, বরং উচ্চশিক্ষার মান ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রতিও এক ধরনের অবহেলার প্রকাশ।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে অ্যাসাইনমেন্ট সংরক্ষণ এবং ফিডব্যাকসহ শিক্ষার্থীদের কাছে খাতা ফেরত দেওয়া নিশ্চিত করা।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ  বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ও ভাইভা- সবই শিক্ষার্থীদের পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অ্যাসাইনমেন্ট সাধারণত নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের ওপর করা হয়, তাই এটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোর্সের শিক্ষক মূল্যায়নের পর খাতায় শিক্ষার্থীদের ভুল ও দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ফিডব্যাক দেবেন। তবে মূল্যায়ন শেষে খাতাগুলো কেজি দরে বিক্রি না করে বিভাগে সংরক্ষণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে ভালো হয়, শিক্ষার্থীদের খাতায় ভুলগুলো চিহ্নিত করে সেটি তাদের কাছে ফেরত দেওয়া। এতে তারা নিজেদের ত্রুটিগুলো সহজে বুঝতে এবং ভবিষ্যতে সংশোধন করতে পারবে। পাশাপাশি মানসম্মত কিছু অ্যাসাইনমেন্ট নির্বাচন করে বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে নতুন শিক্ষার্থীরা সেগুলো অনুসরণ করে আরও ভালো মানের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে উৎসাহিত হবে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের শেখার ও মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মূল্যায়নের পর খাতাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং ফিডব্যাকসহ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা অধিক যুক্তিযুক্ত। যদি কোথাও খাতা বিক্রির মতো কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।