হেপাটাইটিস প্রতিরোধে যা করবেন
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ।
সময়মতো সচেতনতা, টিকাদান, পরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাল হেপাটাইটিসের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, অনেক মানুষ বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ ছাড়াই ভাইরাস বহন করেন।
ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তখন লিভার সিরোসিস কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়ে যায়।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করা যায়, চিকিৎসা করা যায় এবং হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে এটি নিরাময়ও সম্ভব। কিন্তু সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক মানুষ গুরুতর জটিলতার মুখে পড়ছেন।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধে যা করবেন
জন্মের পর দ্রুত হেপাটাইটিস বি টিকা দিন
নবজাতকের জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকার বাকি ডোজগুলোও সম্পন্ন করা জরুরি।
রক্ত নেওয়ার আগে পরীক্ষা নিশ্চিত করুন
রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেটি হেপাটাইটিস বি ও সিসহ বিভিন্ন সংক্রমণের জন্য পরীক্ষিত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। নিরাপদ রক্ত গ্রহণ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
সুচ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত হতে হবে
একই সিরিঞ্জ বা সুচ একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ইনজেকশন, চিকিৎসা, দাঁতের চিকিৎসা কিংবা ট্যাটু ও পিয়ার্সিংয়ের সময় জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগ করবেন না
রেজর, নেইল কাটার, টুথব্রাশসহ রক্তের সংস্পর্শে আসতে পারে, এমন ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত নয়।
নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করুন
হেপাটাইটিস বি রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। তাই সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা করান
আগে রক্ত নেওয়ার ইতিহাস থাকলে, পরিবারের কারও হেপাটাইটিস থাকলে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করলে কিংবা অন্য কোনো ঝুঁকির মধ্যে থাকলে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করানো উচিত। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা সহজ হয়।
গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা জরুরি
গর্ভবতী নারীর হেপাটাইটিস বি শনাক্ত করা গেলে মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তাই গর্ভাবস্থায় স্ক্রিনিংকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
উপসর্গ না থাকলেও সতর্ক থাকুন
হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব, অতিরিক্ত দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা কিংবা দীর্ঘদিন পেটের ডান পাশে অস্বস্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসায় দেরি নয়
হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধ রয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসায় হেপাটাইটিস সি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তাই পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
সচেতনতা বাড়ান, বৈষম্য নয়
সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন। এ কারণে পরিবার ও সমাজে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্যমুক্ত আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা। ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো ও জনসচেতনতা তৈরি করা গেলে এ রোগে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।