নিরাপদ জীবন ও পরিবেশের জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক বন্ধের দাবি কৃষকদের

Farmers demand ban on highly hazardous pesticides
নিজস্ব প্রতিনিধি:- ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৫৬ অপরাহ্ন সারা বাংলা
নিজস্ব প্রতিনিধি:- ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৫৬ অপরাহ্ন
নিরাপদ জীবন ও পরিবেশের জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক বন্ধের দাবি কৃষকদের
নিজেদের উৎপাদিত নিরাপদ কৃষি শস্য ফসল ও দেশী বীজ প্রদর্শন করে অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক বন্ধের দাবি জানায় কৃষকরা

রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের বড়গাছি গ্রামে এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী কৃষক কৃষানীরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকমুক্তভাবে উৎপাদন করা নিরাপদ কৃষি শস্য ফসল ও দেশী বীজ প্রদর্শন করে অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক বন্ধের দাবি জানায় কৃষকরা। এগ্রোইকোলজি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে গ্রিন কোয়ালিশনের গ্রাসরুট নারীদের উদ্যোগে কমিউনিটি আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়েছে। সভায় নিরাপদ কৃষি চর্চাকারী ৩০ জন নারী ও পুরুষ কৃষক অংশহণ করেন।


আজ মঙ্গলবার (১৮ আগষ্ট ২০২৬) গ্রিন কোয়ালিশন, উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক আয়েজিত এই সভায় কৃষকরা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার তৌহিদুল এর সঞ্চালনায় তারা বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে গ্রামে এখন পাখির সংখ্যা কমে গেছে। ফলে ফসলে পোকামাকড়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বিল ও কৃষিজমির পানি বারনই নদীতে মেশে এর ফলে নদীর দেশিয় মাছ কমে গেছে। বাংলাদেশ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১০০ জন ক্যন্সার রোগীর মধ্যে ৬৪ জনই কৃষক। এই কৃষকরা কৃষিকাজে দীর্ঘদিনধরে নানাভাবে রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করে আসছেন।


বড়গাছির দাদপুর বাগিচাপাড়ার এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী তরুন কৃষক হৃদয় হাসান বলেন, “কীটনাশক ক্রয়ের মাধ্যমে আমাদের পকেটের টাকা অন্যজন খাচ্ছে। আমাদের পকেটের টাকা বাঁচাতে হবে। এরজন্য আমাদের এগ্রোইকোলজি চর্চা করতে হবে। জৈব বালাই তৈরী ও ব্যবহার শিখতে হবে।” মাধবপুরের কৃষাণী রুবিনা বেগম বলেন, “আমরা নিমপাতা, ছাই, বিষকাঠালি, মেহগণির বীজ ইত্যাদি গাছ গাছলার ছাল, পাতা থেকে রস করে জৈব বালাই ব্যবহার করে পোকামাকড় দমন করি।”


কৃষক আব্দুল জব্বার বলেন, “আমি ১০ কাঠা মাটিতে পেপে চাষ করছি। পরীক্ষা করার জন্য আমি কিছু গাছে জৈব বালাই ব্যবহার করি নি সেগুলোতে অনেক দাগ পড়েছে কিন্তু বাকিগুলোতে আমি নিমপাতার রস ব্যবহার করেছি সেগুলোতে আর কোন দাগ পড়েনি। কে বলে বিষ ছাড়া আবাদ হয় না? সঠিকভাবে জৈব সার ও জৈব বালাই ব্যবহার করলে বিষমুক্ত উপায়ে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।”


গ্রিন কোয়ালিশন পবা উপজেলার কৃষানী রহিমা বেগম বলেন, “আমরা যখন ঘরের কাছেই প্রয়োজনীয় কৃষি সম্পদ পাচ্ছি, যেখান থেকে আমরা সহজেই জৈব বালাই তৈরী করতে পারি তখন কেন আমরা বিষ কিনে জমিতে দেব? ক্ষতিকর কীটনাশকের অবাধ বিজ্ঞাপন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে এবং নিরাপদ কৃষিকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।”


সভায় জানানো হয় বড়গাছি ইউনিয়নে ৩০ টি মডেল শতবাড়ি এবং ২টি এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার ও কমিউনিটি বীজ ব্যাংক রয়েছে। মডেল শতবাড়ি গুলোতে এই বীজগুলো মৌসুম ভিত্তিক উৎপাদন করা হয় এবং অতিরিক্ত বীজগুলো এএলসিতে জমা করা হয় এবং অন্যান্য বীজগুলো মৌসুমভিত্তিক কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে বিনিময় করা হয়। এএলসিতে কৃষক-কৃষাণীরা জৈববালাই তৈরী ও ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং নিজেরা চর্চা করেন।


সভায় নারী কৃষকগণ তাদের নিজস্ব উৎপাদিত বীজ হাতে তুলে ধরে প্রদর্শন করে নিজেদের বীজ সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার দাবি জানান, একইসাথে  গ্রামের ভেতরে কীটনাশক বিক্রি বন্ধের দাবি জানান। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বীজ কৃষকের নিজস্ব সম্পদ এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বের ভিত্তি। তাই স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিনিময়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ও অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।


বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, “আমরা আর বিষ খেতে চাই না, তেমনি কৃষকরাও চায় নিরাপদ উপায়ে খাদ্য উৎপাদন করতে কিন্তু এরজন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এগ্রোইকোলজি রুপান্তর কর্মসূচী গ্রহন ও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। অবিলম্বেই সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


সভা থেকে স্থানীয় বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে ইউনিয়নভিত্তিক সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি, কমিউনিটি বীজ ব্যাংক সম্প্রসারণ, কৃষকের স্থানীয় জ্ঞান ও এগ্রোইকোলজি চর্চার স্বীকৃতি এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ও অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।