লক্ষাধিক কোটি টাকার উন্নয়নেও॥ নিরাপদ নয় রেল
★এক দশকে শতাধিক দুর্ঘটনা,
★প্রাণহানি ও লাইনচ্যুতি,
★পুরোনো কোচ-লোকোমোটিভ,
★দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ,
★ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং ও সিগন্যাল
নতুন রেললাইন হচ্ছে, নতুন স্টেশন নির্মাণ হচ্ছে, আধুনিকায়নে ব্যয় হচ্ছে লক্ষাধিক কোটি টাকা। কোনো কোনো রেলপথে নতুন ট্রেন যুক্ত হয়েছে, বাড়ছে প্রকল্পের সংখ্যা। কাগজে-কলমে বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা যেন উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের বিপরীতে বারবার সামনে আসছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—ট্রেন দুর্ঘটনা, লাইনচ্যুতি, লেভেল ক্রসিংয়ে প্রাণহানি, সিগন্যালিং ত্রুটি এবং পুরোনো অবকাঠামোর দুর্বলতা।
এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে প্রশ্নটি তাই আরও গভীর হয়—রেলে বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু নিরাপত্তা কি সেই অনুপাতে বাড়ছে?
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩—এই পাঁচ অর্থবছরেই দেশে ৪৩২টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ সালে ৯১টি, ২০১৯-২০ সালে ৮০টি, ২০২০-২১ সালে ১১১টি, ২০২১-২২ সালে ৭৯টি এবং ২০২২-২৩ সালে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটে। একই সময়ে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৬ জন এবং আহত হয়েছেন ২৩২ জন।
আর বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত সাত অর্থবছরের হিসাব—২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩—মিলিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০১টি।অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই গড়ে বছরে প্রায় ৮৬টি ট্রেন দুর্ঘটনা।
কিন্তু রেলের দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও বিস্তৃত। কারণ রেলওয়ের “ট্রেন দুর্ঘটনা”র হিসাবের বাইরে লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, অটোরিকশা কিংবা পথচারীর সংঘর্ষকে বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা ও সংগঠন আলাদাভাবে গণনা করে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালে ২৫৩টি রেল দুর্ঘটনায় ২৩০ জন নিহত এবং ২৩৮ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আরও ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৮ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যানের পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রেল দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিক নিরাপত্তা সংকট।
এক দশকের আলোচিত দুর্ঘটনা: কোথায়, কীভাবে, কেন?
গত দশকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনাগুলো দেখলে রেল নিরাপত্তার সমস্যার ধরনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৬: নরসিংদী ও চট্টগ্রামে লাইনচ্যুতি:-
২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি নরসিংদীর আরশীনগরে একটি কমিউটার ট্রেনের লোকোমোটিভ লাইনচ্যুত হয়ে দুজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। একই বছর ফৌজদারহাটে কনটেইনারবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে চালক ও সহকারী চালক আহত হন। অক্টোবরে হবিগঞ্জের নোয়াপাড়ার কাছে পারাবত এক্সপ্রেসের লোকোমোটিভে আগুন ও লাইনচ্যুতির ঘটনাও ঘটে। এই ঘটনাগুলো দেখায়, শুধু সংঘর্ষ নয়—রোলিং স্টক, যান্ত্রিক ত্রুটি ও লাইনচ্যুতিও রেলের বড় ঝুঁকি।
২০১৮: টঙ্গীর ভয়াবহ লাইনচ্যুতি:-
২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি ট্রেনের পাঁচটি কোচ লাইনচ্যুত হয়। এতে পাঁচজন নিহত এবং প্রায় ৫০ জন আহত হন।
একই বছর চাঁদপুরে মেঘনা এক্সপ্রেসের পাওয়ার কারে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুন লাগে। যাত্রীরা আতঙ্কে নামতে গিয়ে প্রায় ৩০ জন আহত হন।
২০১৯: এক বছরেই একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনা:-
২০১৯ সাল বাংলাদেশের রেল দুর্ঘটনার ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের কয়েকটি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে খালে পড়ে যায়। ভেঙে পড়া কালভার্টের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হন।এরপর ১২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন নিহত ও ৭৩ জন আহত হন। তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে চালকের দায়িত্বে অবহেলা ও সংকেত অনুসরণের ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে আসে।
পরদিনই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেসের লোকোমোটিভসহ সাতটি কোচ লাইনচ্যুত হয় এবং কয়েকটি কোচে আগুন ধরে যায়; অন্তত ২৫ জন আহত হন।
এক বছরেই লাইন, লেভেল ক্রসিং, সংকেত, পরিচালনা ও আগুন—রেলের প্রায় প্রতিটি নিরাপত্তা স্তরের দুর্বলতা যেন সামনে চলে আসে।
২০২০: লেভেল ক্রসিং আবারও প্রাণঘাতী:-
২০২০ সালের ৭ নভেম্বর গাজীপুরে নীলসাগর এক্সপ্রেসের সঙ্গে লেভেল ক্রসিংয়ে আটকে থাকা একটি বাসের সংঘর্ষে দুজন নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হন।
১৯ ডিসেম্বর জয়পুরহাটের পুরানাপুল রেলগেটে উত্তরা এক্সপ্রেসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত ও তিনজন আহত হন।
এই দুর্ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করে—রেল নিরাপত্তার অন্যতম দুর্বল জায়গা হলো লেভেল ক্রসিং।
২০২১–২২: দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১১টি দুর্ঘটনা ঘটে। পরের অর্থবছরেও ৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটে।
অর্থাৎ দুর্ঘটনা কোনো নির্দিষ্ট একটি বছরের সমস্যা নয়। এটি অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা ও লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।
২০২২ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হন।
২০২৩: ভৈরবের দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দেয় রেল নিরাপত্তাকে:-
২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ঘটে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাগুলোর একটি।
ঢাকাগামী এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের পেছনের কোচে একটি মালবাহী ট্রেন ধাক্কা দিলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১৮-১৯ জনে পৌঁছায় এবং বহু মানুষ আহত হন।
প্রাথমিকভাবে সিগন্যাল অমান্য বা লাল সংকেত অতিক্রমের বিষয়টি সামনে আসে। পরে তদন্তেও চালক, সহকারী চালক ও গার্ডের সংকেত যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ না করার কথা উঠে আসে।
এখানে প্রশ্নটি শুধু একজন চালকের ভুলে সীমাবদ্ধ থাকে না।একটি আধুনিক রেলব্যবস্থায় একটি ভুল সংকেত অতিক্রম করলেই কীভাবে দুইটি ট্রেন মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকিতে পড়ে?
নিরাপত্তাব্যবস্থার উদ্দেশ্যই তো হওয়া উচিত—একজন মানুষের ভুল যেন শত মানুষের মৃত্যুর কারণ না হয়।
২০২৪: দুর্ঘটনার আরেকটি বড় চিত্র:-
২০২৪ সালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু, লেভেল ক্রসিংয়ে সংঘর্ষ, ট্রাকের সঙ্গে ট্রেনের ধাক্কা এবং অন্যান্য দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকে। টঙ্গীতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে একজন নিহত হন।
ঢাকার কাওলা, মগবাজার, খিলক্ষেত ও বিমানবন্দর এলাকাতেও পৃথক ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবে বছরটির সামগ্রিক চিত্র আরও বড়। বুয়েটের এআরআইয়ের হিসাবে ২০২৪ সালে ২৫৩টি রেল দুর্ঘটনায় ২৩০ জন নিহত হন।
২০২৫: সংখ্যা আরও উদ্বেগজনক:-
২০২৫ সালেও দুর্ঘটনা থামেনি। ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুরের বিরামপুরে ঘোড়াঘাট রেলক্রসিংয়ে একতা মেইল ট্রেনের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে দুজন নিহত হন।
জুনে রাজধানী ও টঙ্গী এলাকায় পৃথক ট্রেন দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হন। জুলাইয়ে নরসিংদীতে রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় এক কিশোর নিহত হন।
আগস্টে কক্সবাজারের রামুর ধলিরছড়া রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজি অটোরিকশার চার যাত্রী নিহত হন।
আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে পুরো ২০২৫ সালে রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
২০২৬: কুমিল্লার পদুয়ার বাজার আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে আনল:-
২০২৬ সালের ২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে একটি যাত্রীবাহী বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়।
দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের পর প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের তদন্তে গেটম্যান, স্টেশন মাস্টার, লোকোমাস্টারসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও বিভাগের দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসে।
অর্থাৎ এক দশক ধরে যে প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে—লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন?—কুমিল্লার ঘটনাও সেই প্রশ্নের নতুন সংস্করণ হয়ে দাঁড়ায়।
শনিবার (২২ আগস্ট)২২ আগস্ট ছিলো রেলের শনিরদশা। পশ্চিমাঞ্চল রেলে চলাচলকারী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ও বাংলাবান্ধর কোচ ড্যামেজ।অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল রেলে চলাচলকারী উপকূল,মহানগর ও চট্রলার লোকো ফেইল।তবুও রেল বোলছে যাত্রী সেবার কোট ঘাটতি নাই!
দুর্ঘটনার কারণগুলো কি আলাদা, নাকি একই?:-
এক দশকের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে দুর্ঘটনার কারণগুলোকে মোটামুটি কয়েকটি ভাগে দেখা যায়।
১. অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং:-
রেল নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংগঠনের হিসাবে রেলপথের দুর্ঘটনার প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত লেভেল ক্রসিংকেন্দ্রিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গেটম্যানের অনুপস্থিতি, অরক্ষিত ক্রসিং এবং চালক-পথচারীর অসচেতনতা।
২. সিগন্যালিং ও পরিচালনাগত ত্রুটি:-
ভৈরবের দুর্ঘটনা দেখিয়েছে, সিগন্যাল ব্যবস্থায় একটি ভুল বা সংকেত অমান্য করার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানবিক ভুলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৩. রেললাইন ও অবকাঠামোর দুর্বলতা:-
কুলাউড়ার মতো দুর্ঘটনায় অবকাঠামোর ত্রুটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সেতু-কালভার্ট পরিদর্শন এবং রেললাইনের মান নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
৪. পুরোনো কোচ ও লোকোমোটিভ:-
দীর্ঘদিন ব্যবহৃত রোলিং স্টককে আধুনিকায়ন না করে শুধু মেরামত করে চালিয়ে গেলে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি থেকেই যায়। কোচের বয়স, লোকোমোটিভের অবস্থা, ব্রেকিং সিস্টেম, চাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. দক্ষ জনবল ও জবাবদিহিতা:-
রেল পরিচালনা একটি অত্যন্ত কারিগরি ব্যবস্থা। চালক, সহকারী চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টার, সিগন্যাল কর্মী, গেটম্যান ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী—প্রত্যেকের দায়িত্ব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
একজনের ভুল অন্যজনের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু নিচের স্তরের কর্মীকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।
পূর্বাঞ্চলের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণেও বিশেষজ্ঞরা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন পর্যায়ে জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছেন।
তাহলে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ যাচ্ছে কোথায়?
রেল উন্নয়নে বড় প্রকল্প প্রয়োজন—এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি পুরোনো ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হচ্ছে কি না।
একটি নতুন রেললাইন নির্মাণ করলে তার সঙ্গে শুধু লাইন নয়—সিগন্যালিং, স্টেশন, সেতু, লেভেল ক্রসিং, রোলিং স্টক, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন দৃশ্যমান; কিন্তু নিয়মিত রেললাইন পরীক্ষা, পুরোনো কোচের চাকা বদলানো, সিগন্যালিং যন্ত্র পরীক্ষা, লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করা কিংবা দক্ষ কর্মী তৈরি—এসবের ফলাফল সাধারণ মানুষের চোখে ততটা দৃশ্যমান নয়।কিন্তু রেলের প্রকৃত নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় এই অদৃশ্য কাজগুলোর ওপরই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—উন্নয়ন হচ্ছে, নাকি শুধু প্রকল্প বাড়ছে?
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, রেলের উন্নয়ন পরিমাপ করা উচিত—দুর্ঘটনা কত কমেছে? লাইনচ্যুতি কত কমেছে? লেভেল ক্রসিং কতটা নিরাপদ হয়েছে? পুরোনো কোচ ও লোকোমোটিভের ওপর নির্ভরতা কতটা কমেছে? ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা কতটা বেড়েছে? সিগন্যালিং কতটা আধুনিক হয়েছে? দক্ষ জনবল কতটা বেড়েছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যাত্রী কতটা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত।
রেল কি ধ্বংসের দিকে, নাকি সংস্কারের সন্ধিক্ষণে?
বাংলাদেশের রেলপথ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। কারণ একই সময়ে রেলে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে এবং হচ্ছে।
কিন্তু দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা, লেভেল ক্রসিংয়ের প্রাণহানি, লাইনচ্যুতি, সিগন্যালিং সমস্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির অভিযোগকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।বরং বর্তমান চিত্রটি বলছে—বাংলাদেশের রেল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও পুনর্গঠনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
এখন প্রয়োজন প্রকল্পের পর প্রকল্প নয়; -প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রেল নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
প্রথম ধাপে দেশের সব লেভেল ক্রসিংয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট করে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং বন্ধ বা আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এরপর রেললাইন, সেতু-কালভার্ট, সিগন্যালিং, কোচ ও লোকোমোটিভের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী ঝুঁকি-মানচিত্র তৈরি করতে হবে।একই সঙ্গে প্রয়োজন চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টার, সিগন্যাল কর্মী ও গেটম্যানদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ জবাবদিহিতা।
আর দুর্ঘটনার তদন্তও হতে হবে স্বাধীন ও কার্যকর। শুধু একজন চালক বা গেটম্যানকে শাস্তি দিয়ে তদন্ত শেষ না করে কেন সেই ভুল ঘটল, কোন ব্যবস্থাগত দুর্বলতা তাকে সুযোগ দিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে একই ঘটনা ঠেকানো যাবে—সেটিই হতে হবে তদন্তের মূল প্রশ্ন।
কারণ একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়, তদন্ত কমিটি করা যায়, কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা যায়; কিন্তু একটি প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
গত এক দশকের দুর্ঘটনাগুলো তাই বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে—রেলের উন্নয়ন শুধু নতুন লাইন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে নিরাপদ রেল।
হাজার কোটি টাকা খরচ করে যদি নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়, কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার নিরাপত্তা দুর্বল থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ নয়।
আর যদি বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা কমে, নিরাপদ লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়, আধুনিক সিগন্যালিং চালু হয়, পুরোনো রোলিং স্টক পর্যায়ক্রমে সরানো হয়, দক্ষ জনবল তৈরি হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়—তবেই বলা যাবে, বাংলাদেশ সত্যিই রেলপথের উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে।
প্রশ্ন তাই রেল থাকবে কি না—সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো, যে রেল কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, সেই রেলকে আমরা কতটা নিরাপদ করে তুলতে পারছি?এই প্রশ্নের উত্তর এখনই খোঁজা জরুরি।