প্রাণীহীন রাজশাহী চিড়িয়াখানা, সৌন্দর্য আছে—নেই মূল আকর্ষণ
বড় বড় খাঁচা, হাঁটার পথ, সবুজ পরিবেশ, পুকুর ও শিশুদের বিনোদনের নানা আয়োজন—সবই আছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায়। নেই শুধু সেই প্রাণীগুলো, যাদের দেখতে দর্শনার্থীরা চিড়িয়াখানায় আসেন। বাঘ, সিংহ, হাতির মতো বড় প্রাণী না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে বেশ কয়েকটি খাঁচা। ফলে অবকাঠামোগত সৌন্দর্য বাড়লেও প্রাণীসংখ্যার ঘাটতিতে ধীরে ধীরে মূল আকর্ষণ হারাচ্ছে প্রায় ৩৩ একর আয়তনের এই বিনোদনকেন্দ্রটি।
১৯৭২ সালে চালু হওয়া রাজশাহী চিড়িয়াখানাটি ১৯৯৬ সাল থেকে পরিচালনা করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম প্রধান স্থান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এই চিড়িয়াখানায় সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও প্রাণী সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের।
আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০২১ সাল থেকে প্রায় দুই বছর চিড়িয়াখানাটি বন্ধ রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়। তবে উন্নয়নকাজের সময় কয়েকশ পুরোনো গাছ কাটা এবং কয়েকটি পশুপাখির খাঁচা ভেঙে নভোথিয়েটার ও গেস্ট হাউস নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন সচেতন নাগরিকরা।
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা শিশুদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ থাকে বাঘ, সিংহ, হাতি, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী। কিন্তু বড় প্রাণীর অনুপস্থিতিতে অনেক শিশুই হতাশ হচ্ছে। দর্শনার্থীদের ভাষ্য, বর্তমানে জায়গাটি দেখতে সুন্দর হলেও প্রাণীসংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় এটি অনেকটা উদ্যান বা পার্কের মতো মনে হচ্ছে; চিড়িয়াখানার স্বতন্ত্র আকর্ষণ আর আগের মতো নেই।
এক দর্শনার্থী বলেন, “আগে চিড়িয়াখানায় এলে এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায় ঘুরে বিভিন্ন পশুপাখি দেখার আনন্দ ছিল। এখন বড় প্রাণী না থাকায় সেই আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে।”
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, সীমিত জায়গায় সাফারি পার্কের আদলে চিড়িয়াখানা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কী ধরনের প্রাণী রাখা সম্ভব, তাদের জন্য কী ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন এবং খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এএম সালেহ রেজা বলেন, একটি আধুনিক চিড়িয়াখানার জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। শুধু প্রাণী এনে খাঁচায় রাখলেই হবে না। প্রাণীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও আচরণের উপযোগী পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার ও পানি, নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিড়িয়াখানাকে আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধন যথেষ্ট নয়। প্রাণীর কল্যাণ ও দর্শনার্থীদের বিনোদন—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রজাতিভিত্তিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত আবাসন এবং নিয়মিত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় প্রাণী সংযোজন, প্রাণীবান্ধব পরিবেশ তৈরি, খাঁচার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ করা গেলে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা আবারও নগরীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে তার হারানো আকর্ষণ ফিরে পেতে পারে।