নারীসহ ফ্ল্যাটে সাবেক ওসি, দরজা ভেঙে দুজনকে থানায় নিল পুলিশ
রাজশাহীতে সাবেক ওসি মাহবুব আলমকে এক নারীসহ একটি ফ্ল্যাট থেকে থানায় নেওয়ার ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিজেকে মাহবুবের ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করা এক নারীর অভিযোগের পর শুক্রবার(১৮সেপ্টেম্বর) সকালে নগরীর নাদের হাজির মোড় এলাকায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ওই ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
পরে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ নামের ওই নারীকে চন্দ্রিমা থানায় নেওয়া হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ ঘটনা নিয়ে চন্দ্রিমা থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের স্ত্রী দাবি করে অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী ওই ফ্ল্যাটে অন্য এক নারীর সঙ্গে অবস্থান করছেন। খবর পেয়ে নওগাঁ থেকে রাজশাহীতে এসে দীর্ঘ সময় দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে দরজা খোলা হয়নি বলে জানান তিনি।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাদের হাজির মোড়ের ওই ফ্ল্যাটটি মাহবুব আলমের পালিত মেয়ের নামে ভাড়া নেওয়া। ওই মেয়ে ও তাঁর স্বামী সেখানে বসবাস করেন। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ওই ফ্ল্যাটে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়।
সকালে সেখানে গিয়ে আন্নি আক্তার দরজা খোলার জন্য ডাকাডাকি করেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে চন্দ্রিমা থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও দরজা না খোলায় শেষ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা নেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
দুজনের দুই দাবি:-
ফ্ল্যাট থেকে বের করার পর সানজিদা মৌ মাহবুব আলমকে তাঁর স্বামী বলে দাবি করেন। তবে ঘটনাস্থল ও থানায় উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তিনি এ বিষয়ে কোনো কাগজপত্র দেখাননি।
অন্যদিকে, ফ্ল্যাটের বাইরে থাকা আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তবে মাহবুব আলম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি চার দিন আগে আন্নি আক্তারকে তালাক দিয়েছেন।
মাহবুব আলম দাবি করেন, সানজিদা মৌ তাঁর স্ত্রী। পুলিশকে তিনি আন্নিকে তালাক দেওয়ার কাগজ দিয়েছেন বলেও জানান। তবে সানজিদার সঙ্গে তাঁর বিয়ের কাবিননামা সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি।অন্যদিকে আন্নি আক্তারের দাবি, তিনি তালাকের কোনো কাগজ পাননি।
একাধিক বিয়ের অভিযোগ আন্নির:-
নওগাঁর বাসিন্দা আন্নি আক্তার নিজেকে নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাহবুব আলম বিভিন্ন জেলায় কর্মরত থাকার সময় একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও বিয়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন।
আন্নির দাবি, বিয়ের পর মাহবুব আলম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরের পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুব আলমের একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগে ওই ফ্ল্যাটে সানজিদা মৌয়ের সঙ্গে মাহবুবকে দুই দিন পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তখন পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে জানান আন্নি।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে খবর পান মাহবুব আলম তাঁর পালিত মেয়ের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে এসেছেন এবং সেখানে সানজিদা মৌও রয়েছেন। এরপর শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি সেখানে পৌঁছান।
আন্নির ভাষ্য, দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দরজা খোলার অনুরোধ করা হলেও ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেননি। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পরও দরজা না খোলায় ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়।
দরজা ভাঙার পর থানায়:-
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার পর মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে বের করে আনা হয়। পরে তাঁদের চন্দ্রিমা থানায় নেওয়া হয়। থানায় তাঁদের পৃথক দুটি কক্ষে রাখা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাহবুব আলমের সঙ্গে আন্নি আক্তারের তালাকের বিষয়ে একটি কাগজ পাওয়া গেছে। তবে আন্নি দাবি করেছেন, তিনি এ ধরনের কোনো কাগজ হাতে পাননি। ফলে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে আইনগত অবস্থান কী, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আন্নি আক্তার। শুক্রবার দুপুরে তাঁর অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল। তিনি মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
আগেও আলোচনায় ছিলেন মাহবুব:-
মাহবুব আলম ২০২৪ সালে রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়। পরে তাঁকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর তিনি নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশের অধীনে রয়েছেন। তবে রাজশাহীতে আসার আগে তিনি কোনো ছুটি বা অনুমতি নেননি।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, “মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর সিদ্ধান্ত হবে।”তিনি বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, তিনি কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটি জেনেছেন। মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই এবং কাউকে না জানিয়েই তিনি রাজশাহীতে গেছেন বলে জানান তিনি।
মোস্তাক আহমেদ বলেন, “বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করাও একটি অপরাধ।
তিনি আরও জানান, মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশের অধীনে রয়েছেন। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তারা এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, ফ্ল্যাটে মাহবুব আলমের সঙ্গে থাকা সানজিদা মৌ তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কের দাবি করলেও এ দাবির পক্ষে কোনো নথি তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। একইভাবে আন্নি আক্তারের একাধিক বিয়ে ও সম্পর্কসংক্রান্ত অভিযোগগুলোরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত অবস্থান নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।