রেলকর্মীদের সঙ্গে ‘ক্ষমতার দাপট’, রাবি স্টেশনের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন

'Power struggle' with railway workers
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৫৬ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৫৬ অপরাহ্ন
রেলকর্মীদের সঙ্গে ‘ক্ষমতার দাপট’, রাবি স্টেশনের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন
ছবি - বিজয় বাংলা

বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যাত্রী, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি কিংবা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের অসৌজন্যমূলক আচরণ ও দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন ও ট্রেনে এমন ঘটনার অভিযোগ উঠেছে।

 সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) স্টেশনে ট্রেন থামানোর জন্য চেইন টানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থী ও রেলকর্মীদের মধ্যে বিরোধ নতুন করে বিষয়টি সামনে এনেছে।,গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেসে এ ঘটনা ঘটে।

 রাবি স্টেশনে ট্রেন থামার কথা না থাকলেও ট্রেন থামানোর উদ্দেশ্যে চেইন টানার অভিযোগ ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

 পরে ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষার্থী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিক্ষার্থীকে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ প্রকাশিত হলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে জানায়, নিয়ম ভঙ্গের কারণে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ন্যূনতম জরিমানা করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে রেলওয়ের কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও নানা বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। আবার রেলকর্মীদের পক্ষ থেকেও দায়িত্ব পালনের সময় যাত্রী বা অন্য কোনো ব্যক্তির চাপ, প্রভাব কিংবা হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

দায়িত্ব পালনে রেলকর্মীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

রেলওয়ে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠান। ট্রেন পরিচালনা, টিকিট পরীক্ষা, নিরাপত্তা, স্টেশন ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট বিধি ও দায়িত্বের মধ্যে কাজ করতে হয়। ফলে কোনো যাত্রী বা ব্যক্তি নিয়ম নিয়ে আপত্তি করলে তা নিয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনরত কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে রেলওয়ে আইন ও নীতিমালার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রেলসেবা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও অভিযোগের জন্য ১৩১ নম্বরে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীদের অধিকার যেমন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্ব পালনরত কর্মীদেরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিধিসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কোনো কর্মচারী দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

‘প্রভাব’ নয়, আইনের প্রয়োগ চান রেলকর্মীরা

বিভিন্ন সময়ে বগুড়ার সোনাতলা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কমলাপুর, লালমনিরহাট, রংপুর ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলকর্মীদের সঙ্গে যাত্রী বা বিভিন্ন পক্ষের বিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার প্রতিটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে ধারাবাহিকভাবে এমন অভিযোগ সামনে আসায় রেলকর্মীদের দায়িত্ব পালনের পরিবেশ এবং রেলওয়ের নিজস্ব বিধিবিধান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে—সে প্রশ্ন উঠছে।

রেলসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে চাপের মুখে পড়েন, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীর জন্য নয়, পুরো রেলসেবা ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগের বিষয়। একইভাবে রেলকর্মীরাও যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্ত ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ট্রেন নির্ধারিত স্টেশনে না থামলে বা কোনো সেবা নিয়ে সমস্যা হলে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। চলন্ত ট্রেন থামাতে অকারণে জরুরি চেইন টানা যাত্রী, ট্রেন এবং রেলপথ—তিনটির জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

রেলওয়ের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে যাত্রীদের বৈধ টিকিট কাটা, অন্যদের টিকিট কাটতে উৎসাহিত করা, ট্রেনে ধূমপান ও মাদক থেকে বিরত থাকা এবং রেলকর্মীদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের প্রতিও প্রত্যাশা—কোনো অভিযোগ বা বিরোধ দেখা দিলে ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা চাপের পরিবর্তে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনরত রেলকর্মীরাও পাবেন প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা।

রেলওয়ে একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাই যাত্রী ও কর্মী—উভয়ের অধিকার এবং দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই রেলসেবার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।