ক্লিন নোট’ নীতির পরও নোটে ব্যাংকের সিল- স্বাক্ষর ও লেখালেখি॥ ক্ষতিগ্রস্ত নোটে বাড়ছে জনভোগান্তি
ছেঁড়া, ময়লা কিংবা বারবার স্ট্যাপলিং করা—এমন নোট বাংলাদেশের নগদ লেনদেনে খুবই পরিচিত দৃশ্য। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নোটের ওপর ব্যাংক শাখার সিল, স্বাক্ষর, তারিখ, সংখ্যা কিংবা বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবহারযোগ্য নোটগুলো নোংরা ও অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ছে। অথচ নোট পরিষ্কার ও দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নির্দেশনা রয়েছে।
দেখা যাচ্ছে ১০০০ ৫০০, ১০০ টাকার নোটের ওপর বিভিন্ন ধরনের কালির দাগ, সিল, লেখা ও চিহ্ন দেখা যায়। কোন নোটে বড় আকারে গোলাকার দাগ টানা, কোন নোটে ব্যাংকের সিল,প্রতিষ্ঠানের সিল,কোন নোটে ব্যক্তির নাম বা মোবাইল নাম্বার ও হাতে লেখা দাগ দেখা যাচ্ছে। এসব চিহ্ন স্পস্ট বা সিল গুলো স্পস্ট।
নোটে লেখা ও সিল দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা:-
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসিএম সার্কুলার লেটার নং-০৪/২০২১, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে জারি করা নির্দেশনায় নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য ব্যাংক/কারেন্সি নোটের ওপর লেখা, সিল দেওয়া এবং নোটের প্যাকেটে স্ট্যাপলিং এড়িয়ে চলতে বলা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংকের নোট গণনাকারীরা সরাসরি নোটের ওপর সংখ্যা, তারিখ, শাখার সিল, স্বাক্ষর বা অনুস্বাক্ষর দেওয়ার পাশাপাশি নোটের প্যাকেটে স্ট্যাপলিং করছেন। এতে নোট দ্রুত অপ্রচলনযোগ্য হয়ে যায়, গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দেয়, নোটের ওপর এসব তথ্য না লিখে প্যাকেট ব্যান্ডিং করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখার নাম, সিল, নোট গণনাকারীর স্বাক্ষর ও তারিখসংবলিত লেবেল বা ফ্লাইলিফ ব্যবহার করতে হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ক্ষমতাবলে নির্দেশনা
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২১ সালের ওই নির্দেশনাটি কোনো সাধারণ পরামর্শমাত্র নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সার্কুলার তালিকাতেও ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১-এর ওই নির্দেশনাটি ‘নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য ব্যাংক ও কারেন্সি নোটে লেখা, সীল প্রদান এবং নোটের প্যাকেটে স্ট্যাপলিং পরিহার’ শিরোনামে তালিকাভুক্ত রয়েছে। একই তালিকায় ২০২৩ সালের Clean Note Policy-সংক্রান্ত নির্দেশনাও রয়েছে।
ছেঁড়া বা বিকৃত নোটের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধান
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ২৮ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ছেঁড়া, বিকৃত (defaced) বা অতিরিক্ত ময়লাযুক্ত নোট পুনরায় ইস্যু করবে না।
পরবর্তীতে নোট প্রতিস্থাপন ও বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বিধিমালাও জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নোট প্রতিস্থাপন প্রবিধান, ২০২৫ ৯ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়ে ২০১২ সালের নোট ফেরতসংক্রান্ত প্রবিধান বাতিল করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলোকে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের বিনিময়মূল্য প্রদান এবং দাবিযোগ্য নোট-সংক্রান্ত সেবা নিয়মিত দিতে হবে।
২০২৬ সালের ১২ এপ্রিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক নির্দেশনাতেও ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোটের বিনিময়সংক্রান্ত ব্যবস্থা হালনাগাদ করা হয়েছে।
‘নোট তো যার হাতে, তার’—তবে ইচ্ছেমতো বিকৃত করার সুযোগ নেই
একটি ব্যাংক নোট লেনদেনের মাধ্যমে এক ব্যক্তির হাত থেকে অন্য ব্যক্তির হাতে গেলেও সেটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ইচ্ছেমতো বিকৃত করার বিষয় নয়। নোট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মুদ্রা ব্যবস্থার অংশ। তাই এর পরিচিতি, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখা মুদ্রা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ফেরতসংক্রান্ত বিধিমালায় নোটের আসল পরিচয় ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় হিসাব-চিহ্ন নোটের গায়ে না দিয়ে নির্ধারিত লেবেল, ব্যান্ডিং বা অন্যান্য অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহারের কথা রয়েছে। এতে একটি নোট দীর্ঘ সময় প্রচলনে রাখা সম্ভব হয় এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে নোট বাতিলের চাপও কমে।
প্রশ্ন উঠছে বাস্তবায়ন নিয়ে,বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকার পরও যদি কোনো ব্যাংক শাখা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে নোটের ওপর সিল, স্বাক্ষর, সংখ্যা বা অন্যান্য লেখা দেয়, তাহলে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ক্লিন নোট’ নীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে ৫০০ টাকার মতো বহুল ব্যবহৃত নোটে এ ধরনের চর্চা চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই নোটটি ময়লা, দাগযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। তখন সেটি পুনঃপ্রচলনযোগ্য না থাকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তা আলাদা করে বাছাই ও প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়—যার শেষ পর্যন্ত ব্যয় বহন করতে হয় মুদ্রা ব্যবস্থাকেই।সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘টাকার ওপর লেখা যাবে কি না’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ক্লিন নোট নীতি ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তথ্য:- বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ২৮; ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের DCM Circular Letter No. 04/2021; এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নোট প্রতিস্থাপন প্রবিধান, ২০২৫।