সাংবাদিক এ এ এম রানার চার বছর আগের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ॥ রেলকর্মীদের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানির অভিযোগের শেষ কোথায়?
‘আমি সেদিন মারা গেলে, চার বছর হতো। মারা গেলে রেল বিভাগের ভাষ্য বা পত্রিকার শিরোনাম হতো—চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু। এক লাইনের একটা হিসাব, ফাইলবন্দী হয়ে যেত।’
চার বছর আগে(২০২২ সাল) ঘটে যাওয়া ভয়ংকর এক রেলযাত্রার স্মৃতি এভাবেই বর্ণনা করেছেন সাংবাদিক এ এ এম রানা, তিনি সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে পেশাগতভাবে সময় টিভির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দাবি, আলমডাঙ্গা যাওয়ার জন্য রাজশাহী রেল স্টেশনে পৌঁছে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ছেড়ে দেওয়ার পর দৌড়ে চলন্ত ট্রেনের গার্ডের বগির হাতল ধরেছিলেন তিনি। ঠিক তখনই দায়িত্বে থাকা গার্ড তাঁকে ধাক্কা দেন।
চলন্ত ট্রেন, এক হাতে শুধু হাতল, নিচে রেললাইন—কয়েক সেকেন্ডের সেই মুহূর্তকে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন রানা। তাঁর ভাষায়, সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে সেদিন তিনি নিজেকে সামলে নিতে পেরেছিলেন।
কোনোমতে গার্ডের বগিতে উঠে তাঁর আরও একটি অভিজ্ঞতা হয় বলে দাবি করেন তিনি। রানার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে কয়েকজন যাত্রীকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে ট্রেনে উঠতে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কাছেও টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু তিনি টিকিট দেখালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।তাঁর অভিযোগ, টিকিট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। এমনকি তাঁকে মারতে তেড়ে আসেন ওই গার্ড।
চার বছর পরও সেই ঘটনার স্মৃতি মুছে যায়নি সাংবাদিক রানার। বরং তাঁর প্রশ্ন—রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরও যদি একজন যাত্রী প্রতিকার না পান, তাহলে সাধারণ যাত্রী কোথায় যাবেন?
অভিযোগ করতে গিয়েও ‘দপ্তর থেকে দপ্তরে’:-
রানা জানান, ঘটনার পর তিনি সংশ্লিষ্ট গার্ডের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ করার প্রক্রিয়াতেই তাঁকে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে রেলভবন থেকে ঈশ্বরদী বা পাকশী স্টেশনে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে গেলে সংশ্লিষ্ট স্টেশনে অভিযোগ করতে বলা হয়। সংশ্লিষ্ট স্টেশনে গেলে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি বলেও দাবি তাঁর।এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে তাঁর মনে হয়েছে, অভিযোগ করার পথটিই যেন কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান কাঠামোতে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা রয়েছে। রেলওয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা ও আপিল কর্মকর্তার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ফলে রানার চার বছর আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান অভিযোগ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—অভিযোগের ব্যবস্থা কাগজে থাকলেই কি একজন যাত্রী সহজে প্রতিকার পান?
অভিযোগ শুধু রানার একার নয়:-
রেলের কর্মীদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, মারধর, টিকিট থাকা সত্ত্বেও টাকা দাবি কিংবা নিয়মের বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও রেলকর্মীদের মধ্যে বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী রেলস্টেশনে এক সেনাসদস্যকে মারধরের অভিযোগে, ট্রেনের গার্ড ও দুই অ্যাটেনডেন্টকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। মামলার অভিযোগে ট্রেনে টিকিট দেখানো এবং রেলকর্মীদের আচরণ নিয়ে আপত্তির পর বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। তবে ঘটনা এতদূর গড়ানোই দেখায়, যাত্রী ও দায়িত্বশীল রেলকর্মীর বিরোধ কখনো কখনো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
টিকিট নিয়ে বিরোধ, তারপর রেলপথ অবরোধ:-
সাম্প্রতিক সময়েও রাজশাহীতে টিকিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে রেলকর্মী ও যাত্রীর বিরোধ বড় আকার নিয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রেলপথ অবরোধের ঘটনা ঘটে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, টিকিট পরীক্ষার সময় রসিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। পরে অভিযুক্ত টিটিইকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠনের কথা জানা যায়।
তবে রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তাদের দাবি, ওই শিক্ষার্থীকে হেনস্তা বা মারধর করা হয়নি; নিয়ম ভঙ্গের কারণে তাঁকে জরিমানা করা হয়েছিল।
একই ঘটনায় যাত্রীপক্ষ ও রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
‘অভিযোগ করব’ বলার পরই যদি বিরোধ বাড়ে:-
সাংবাদিক এ এ এম রানার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি জায়গায় মিল রয়েছে—রেলকর্মীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার অভিযোগ।
একজন যাত্রী যখন কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান, তখন তাঁর নিরাপত্তা ও অভিযোগ জানানোর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে কোনো যাত্রী নিয়ম ভঙ্গ করলে রেলকর্মীদেরও নির্ধারিত আইন ও বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু নিয়ম প্রয়োগের নামে গালাগালি, হুমকি, শারীরিক আঘাত কিংবা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
কয়েক টাকার জন্য নিয়ম ভাঙার অভিযোগ:-
রেলের টিকিট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে টিকিটবিহীন যাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদে এসেছে। তবে এসব অভিযোগকে রেলের সব কর্মীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা যাবে না।
কারণ প্রতিদিন হাজারো রেলকর্মী দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁদের বড় অংশই নিয়ম মেনে কাজ করেন। সমস্যাটি তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে এবং সেই অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান জবাবদিহি দেখা যায় না।
যাত্রীরও দায়িত্ব রয়েছে:-
অন্যদিকে যাত্রীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। টিকিট ছাড়া ভ্রমণ, রেলকর্মীর কাজে বাধা দেওয়া, কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কিংবা চলন্ত ট্রেনে ঝুঁকি নিয়ে ওঠার মতো কাজ নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
রানা নিজেই যে ঘটনার কথা বলেছেন, সেখানে চলন্ত ট্রেনে ওঠার বিষয়টিও ছিল। তাই তাঁর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু গার্ডের আচরণ নয়, চলন্ত ট্রেনে ওঠার ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে যাত্রী ভুল করলেও তাঁকে ধাক্কা দেওয়া, মারধর করা বা গালাগালি করার অভিযোগের বৈধতা আলাদা প্রশ্ন। অভিযোগ সত্য হলে সেটির জন্যও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
‘আমি সেদিন মারা গেলে...’:-
চার বছর আগের সেই ঘটনার দিকে ফিরে সাংবাদিক এ এ এম রানা বলেন, সেদিন তিনি মারা গেলে ঘটনাটি হয়তো একটি সাধারণ রেল দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত হতো।
কিন্তু তাঁর দাবি, তিনি দুর্ঘটনায় পড়েননি; বরং চলন্ত ট্রেনে ওঠার সময় গার্ডের ধাক্কায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
এরপর টিকিট থাকার পরও টাকা দাবি, গালাগালি এবং মারতে তেড়ে আসার অভিযোগ তাঁর কাছে ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।আর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—ঘটনার পরও তিনি অভিযোগ করতে পারেননি বলে দাবি তাঁর।
রেলওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন। তাই একজন গার্ড, টিটিই বা অন্য কোনো দায়িত্বশীল কর্মীর আচরণ শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাত্রী নিরাপত্তা, সেবার মান এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা।
রেলের নিয়ম ভাঙলে যাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে—এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে দায়িত্ব পালনের সময় কোনো রেলকর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, অর্থ দাবি, দুর্ব্যবহার কিংবা যাত্রীকে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ উঠলেও তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
চার বছর পরও সাংবাদিক এ এ এম রানার মনে সেই ‘ধাক্কা’ রয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো—এ ধরনের অভিযোগ কি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে, নাকি অভিযোগের প্রতিটি ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে রেলযাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে?।