ফলের বাজার চড়া: নজরদারির আশ্বাস সরকারের
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে একসময় নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ ছিল বিভিন্ন ধরনের ফল। এখন বাড়তি দামের কারণে সেই ফল যেন হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতা বা স্বপ্নের বিষয়। রাজধানীর ফলের বাজারে দামেই প্রথম ধাক্কা খান ক্রেতারা।
আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর ও নাশপাতির মতো আমদানিনির্ভর ফলের দাম গত কয়েক সপ্তাহে আরো বেড়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যেও পেঁপে ও পেয়ারার দাম আগের তুলনায় চড়া। এ কারণে সাধারণ ক্রেতারা আগের মতো একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফল কিনছেন না, বরং হিসাব করে একটি বা দুটি ফলেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করা হবে না। বাজার তদারকি জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, শুধু অভিযান দিয়ে নয়, শুল্ক, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের অস্বচ্ছতার মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধানেও জোর দিতে হবে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, আজিমপুর ও মিরপুরের খুচরা বাজারে দেখা গেছে, আপেল ৩৫০-৪০০ টাকা, মাল্টা ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা, কমলা ২২০ থেকে ৩৪০ টাকা, আঙুর ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং নাশপাতি ৩৩০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় ফলের মধ্যে পেয়ারা ৬০ থেকে ১০০ টাকা, পেঁপে ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি এবং সবরি কলা প্রতি হালি ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আজিমপুরে ফল কিনতে আসা ক্রেতা করিম উদ্দিন বলেন, “আগে বাচ্চাদের জন্য সপ্তাহে দুই-তিন রকম ফল কিনতাম। এখন আপেল কিনতেই ৩০০ টাকা চলে যাচ্ছে।”
মিরপুরে থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী ইমরান হোসেন বলেন, “বেতন বাড়েনি, কিন্তু ফলের বাজারে প্রতিদিনই নতুন করে বাড়তি দাম শুনতে হচ্ছে।”
মিরপুর ১ নম্বরে ফলের বাজারে কথা হলে সাংবাদিক সৈয়দ আলী আল মাসুদ বলেন, “রাজধানীর বাজারে প্রতিটি জিনিসের দামই চড়া। বাজারে কোনো সবজি ১০০ টাকার নিচে নেই। ফলের বাজারও চড়া। সন্তানের জন্য এখন প্রায়ই ফল কিনতে হয়।বাজারে আপেলের কেজি ৪০০টাকার বেশি। আধাকেজি আপেল আর আধাকেজি কমলা কিনতে খরচ হয় ৪০০ টাকার বেশি। অন্য ফলের দাম জানার সহস হন না বিক্রেতাদের কাছ থেকে।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে চাকরিজীবী তৌহিদ মিজান বলেন, “মূলত এই দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে মুনাফা অর্জন করেন।”
মিরপুর-১ নম্বরে ফল কিনতে আসা ইয়াসমিন সুমি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক সপ্তাহ আগে ড্রাগন ফল কিনেছিলাম ১৫০ টাকা কেজি। মঙ্গলবার সেই ড্রাগন ফল কিনতে হয়েছে ২৬০ টাকা কেজি দরে।”
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভার পর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কেউ অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে সরকার ব্যবস্থা নেবে।”
তিনি জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বাজার তদারকি আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো যাবে না।
তবে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, দামের পেছনে বড় কারণ হলো নতুন শুল্ক কাঠামো ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আমদানিকৃত ফলের ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করেছে। এর সঙ্গে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, ব্যাংক চার্জ, বন্দর ব্যয় ও পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে আমদানির মোট ব্যয় বেড়েছে।
বাদামতলী ঘাটের ফল আমদানিকারক শফিক মোল্লা বলেন, “শুল্ক বাড়ার পর আগের দামে ফল বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ডলার, ব্যাংক চার্জ ও পরিবহন- সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে।”
বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। বিক্রেতারা দোকান ভাড়া, শ্রমিক মজুরি ও ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির কথা বললেও ভোক্তাদের অভিযোগ, সব ক্ষেত্রেই এই ব্যবধান যৌক্তিক নয়।
সিপিডির ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজারে অভিযান চালালে দীর্ঘমেয়াদে ফল পাওয়া কঠিন।” তার মতে, কর ও শুল্কনীতি, সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, “মানুষ যখন আয়ের তুলনায় বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনতে বাধ্য হয়, তখন পুষ্টিকর খাবার কেনাও কমে যায়। তাই খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার জরুরি।”
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, আমদানি ব্যয়, শুল্ক কাঠামো এবং বাজারের অস্বচ্ছতা- এই তিনটি বিষয় মূল্যস্ফীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তাঁর মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে অদক্ষতা থাকলে তার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। বাজারে প্রতিদিনের পাইকারি মূল্য প্রকাশ, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা আরো কার্যকর করা গেলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমতে পারে।
পুষ্টিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু দাম বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার ফল কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।
লালবাগের গৃহিণী মারুফা বেগ, বলেন, “আগে সপ্তাহে দুই কেজি ফল কিনতাম। এখন আধা কেজি কিনতেও কষ্ট হয়।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির সময় মানুষ প্রথমেই অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল খাবার কমায়। ফলে ফলের মতো পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণও কমে যেতে পারে।
বাজার তদারকি বাড়ানোর ঘোষণা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু, ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল ব্যয় যদি কমানো না যায়, তাহলে শুধু অভিযানে দীর্ঘমেয়াদে দাম কমানো কঠিন।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বাজারে নজরদারি বাড়বে। কিন্তু, রাজধানীর বাজারে এখনো আমদানিকৃত ফলের দাম উচ্চ অবস্থানেই রয়েছে। ব্যবসায়ীরা শুল্ক ও আমদানি ব্যয়কে কারণ দেখাচ্ছেন, আর অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কেবল প্রশাসনিক অভিযান নয়, নীতিগত ও কাঠামোগত সমাধান ছাড়া টেকসইভাবে দাম কমানো কঠিন।