মুরগির খামারের বর্জ্যে ৩০০ বিঘা জমি ক্ষতির মুখে, বিপাকে কৃষক

300 bighas of land at risk of damage due to chicken farm waste
বিশেষ প্রতিনিধি :- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪৯ অপরাহ্ন সারা বাংলা
বিশেষ প্রতিনিধি :- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪৯ অপরাহ্ন
মুরগির খামারের বর্জ্যে ৩০০ বিঘা জমি ক্ষতির মুখে, বিপাকে কৃষক
নওগাঁর বদলগাছীতে উজালপুর গ্রামে একটি বাণিজ্যিক মুরগির খামারের ময়লা-আবর্জনায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও কৃষক।

নওগাঁর বদলগাছীতে উজালপুর গ্রামে একটি বাণিজ্যিক মুরগির খামারের ময়লা-আবর্জনায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও কৃষক। আশপাশের কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। খামারের মালিক কৌশলে কম দামে জমি কিনে নেওয়ার অপচেষ্টার অভিযোগ করছেন কৃষক।

এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে গড়ে ওঠা এ খামারের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে, এলাকাবাসীকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবে প্রশাসন—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

উপজেলার মিঠাপুর ইউনিয়নের উজালপুর গ্রামে ২০১৭ সালে স্বল্প পরিসরে ‘সম্রাট ফিড এ্যান্ড চিকস’ মুরগির খামার গড়ে তুলেন সিরাজুল করিম মিন্টু (মিন্টু সোনার)। 

খামার শুরুর এক বছরে তেমন কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। তবে খামারের পরিধি বাড়তে থাকলে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। বর্তমানে ৪০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা বাণিজ্যিক খামারে ৪৫ হাজার পিস লেয়ার মুরগি আছে। খামারের ময়লা-আবর্জনা ও পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাঠে ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমি চাষাবাদে বিড়ম্বনায় পড়েছে কৃষক। এতে উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, অপরদিকে বাড়ছে শ্রমিক খরচও। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের অর্থের সুবিধা নিয়ে ওই খামারটিকে প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। খামার কর্তৃপক্ষের এমন খামখেয়ালিপনায় ক্ষোভ এখন চরমে পৌঁছেছে এলাকাবাসীর।

কৃষকরা জানান, মুরগির খামারের ময়লা-আবর্জনা ও পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ছে মাঠের ফসলি জমিতে। ফলে এ মাঠের প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমি এখন ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া খামারের পাশে অন্তত ১২-১৫ কৃষক জমি চাষাবাদ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে। খামারের কারণে খালের ওপর সরকারি টাকায় নির্মিত একটি ব্রিজ কোনো কাজে আসছে না। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন না হওয়া মাঠে জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হয়। এতে একদিকে ফসল উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন হচ্ছে না।

মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আব্দুল আলিম, আফসার আলী ও শফিকুল ইসলাম সহ কৃষকেরা জানান , মুরগির খামারে ময়লা-আবর্জনা ও পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাঠে ছড়িয়ে পড়ায় আবাদ করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। পচা-মরা মুরগি ফেলে দেওয়ার পর শিয়াল ও কুকুর টানা-হেঁচড়া করে ফসল নষ্ট করে দেয়। কম দামে জমি কিনতে পাঁয়তারা করছে খামার মালিক। একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। কোনো সমাধান হয়নি।

কৃষক দুলাল হোসেন, হাসু হোসেন ও আবুল হোসেন বলেন- মাঠের ধান কাটার সময় খামারে পুকুরের ময়লা পানি ছেড়ে দেওয়ায় জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক ধান কাটতে চায় না। মজুরি বেশি নেয়। বিঘাতে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বাড়তি দিয়ে ধান কাটতে হয়। খামারের পাশে সরকারি টাকায় নির্মিত ব্রিজ আছে। মালিক ব্রিজের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় এখন কোনো কাজে আসছে না। এই মাঠের পানি বের হয় না।

সম্রাট ফিড এ্যান্ড চিকস-এর স্বত্বাধিকারী সিরাজুল করিম মিন্টু (মিন্টু সোনার) বলেন- কম দামে জমি কিনে নেওয়ার বিষয়ে কৃষকরা যে অভিযোগ করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সুবিধা না পেয়ে গুজব রটানোর চেষ্টা করছে। নিজেদের জমিতে খামারের ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় এবং বায়োসিকিউরিটির ব্যবস্থা রয়েছে। ফসল ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বদলগাছী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিপা রাণী বলেন, খামারটি নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং সবসময় বলে থাকি বায়োসিকিউরিটি মানতে হবে। যেখানে ঢাকনাযুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়গুলো থাকতে হবে। আমরা প্রতিবারই খামারটি পরিদর্শনের সময় পরামর্শ দিয়ে থাকি। এলাকার চারপাশে পরিবেশদূষণের পরও কেন প্রতিবছর ‘সম্রাট ফিড এ্যান্ড চিকস’ খামারটিকে লাইসেন্স নবায়ন দেওয়া হয় এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

নওগাঁ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমুল হোসাইন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে না করলে পরিবেশদূষণের বিষয়টি সামনে চলে আসে। খামারের কর্মীরা বুঝতে না পারায় কারণে এমনটা হতে পারে।

তিনি আরো বলেন,ইতোমধ্যে ওই খামারটি পরিদর্শন করা হয়েছে। খামারের যে বর্জ্য তা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে বলা হয়েছে। ওই এলাকাটি নিচু হওয়ার কারণে পানির সাথে বর্জ্য ভেসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। খামারিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামীতে যদি এমন চলতে থাকে খামারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।