দেশীয় বীজের অনন্য ব্যাংক: কৃষাণী সুলতানার উদ্যোগে ১৩ গ্রামে ছড়াচ্ছে বিষমুক্ত সবজি চাষ
রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিল নেপালপাড়া গ্রামের একটি সাধারণ বাড়ির উঠান। কিন্তু এই সাধারণ উঠানই এখন পরিণত হয়েছে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বীজের এক বিশাল ভাণ্ডারে।
স্থানীয় কৃষাণী মোসাম্মৎ সুলতানা খাতুনের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই বীজ ব্যাংকে এখন শোভা পাচ্ছে প্রায় ২০০ জাতের দেশীয় বীজ। বহু বছরের পরিশ্রমে সংগৃহীত এই বীজ এখন আর কেবল তাঁর উঠানেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে পবার উপজেলার ১৩টি গ্রামের ঘরে ঘরে।
কৃষি ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, এই ১৩ গ্রামের কৃষক-কৃষাণীরা এখন তাঁদের প্রয়োজনমতো ফসলের বীজ এখান থেকে নিচ্ছেন। বিনিময়ে তারা নিজেদের সংরক্ষিত বীজও সুলতানার ব্যাংকে জমা রাখছেন। বীজ বিনিময়ের পাশাপাশি গ্রামজুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়ছে নিরাপদ সবজি চাষ ও পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষির নানা পদ্ধতি।
এক সাধারণ গৃহবধূর কৃষাণীতে রূপান্তর:-
সুলতানা খাতুনের কৃষির সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। ২০১২ সালে বিয়ের পর ২০১৪ সালে তিনি ডিগ্রি পাস করেন। বিয়ের পর শাশুড়িকে দেখে তিনি কৃষিকাজের প্রতি অনুরাগী হন এবং প্রাথমিক পাঠ নেন।
সুলতানা বলেন, “২০১৬ সাল থেকে বসতবাড়ির আঙিনায় প্রথম নিরাপদ সবজি চাষ শুরু করি। শুরুতে শাশুড়ির কাছে কৃষি কাজ শিখি, পরে পাড়া-প্রতিবেশীদেরও নিরাপদ সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করতে থাকি।”
তাঁর সফল সবজি চাষ দেখে আশপাশের গ্রামীণ নারীরাও দারুণভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নারীদের এই আগ্রহ দেখে সুলতানা ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশীয় বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে খুঁজে খুঁজে স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ ও তা পরম যত্নে সংরক্ষণ করতে থাকেন তিনি। বর্তমানে তাঁর গড়ে তোলা এই 'কম্যুনিটি বীজ ব্যাংকে' প্রায় ২০০ ধরনের দেশীয় বীজ সংরক্ষিত রয়েছে।
কমিউনিটি বীজ ব্যাংক ও ১৩ গ্রামের বিপ্লব:-
দর্শনপাড়া ইউনিয়নের ১৩টি গ্রামের শত শত কৃষক-কৃষাণী নিয়মিত ব্যবহার করছেন সুলতানার এই বীজ ব্যাংক। যার যে বীজের প্রয়োজন, তিনি এসে নির্দ্বিধায় নিয়ে যান। কেউ প্রয়োজনে বীজ নেন, আবার কেউ নিজের বীজ দিয়ে অন্য কোনো জাতের বীজ অদলবদল করে নিয়ে যান।
এভাবে একটি মাত্র বাড়ির উঠান থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন আজ বিস্তার লাভ করেছে বিশাল এলাকা জুড়ে। চলতি বছরেই প্রায় আড়াই হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই এলাকায় অন্তত ৮০০ জনের মাঝে দেশীয় বীজ বিতরণ করেছেন সুলতানা।
রাসায়নিকমুক্ত কৃষির চর্চা ও জৈব বালাইনাশক
বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন সুলতানা। বিভিন্ন উপায়ে জৈব সার তৈরি ও তার ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছেন রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে।
তাঁর এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতোমধ্যে আরও আটটি পরিবার সম্পূর্ণ রাসায়নিক সার ছাড়া জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন ও জৈব সার ব্যবহার শুরু করেছে।
ফসলের বালাই দমনে বিষাক্ত কীটনাশকের বদলে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করছেন জৈব বালাইনাশক। সুলতানার বাড়িতেই বর্তমানে তৈরি হচ্ছে প্রায় ১৫ ধরনের প্রাকৃতিক বালাইনাশক। নিমপাতা, মেহগনি ফল, বাসি ধোতারা মতো স্থানীয় নানা উপাদান মাটির পাত্রে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় এই পরিবেশবান্ধব ওষুধগুলো।
কৃষি গবেষণাবিলা ও শিক্ষণ কেন্দ্র:-
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা 'বারসিক'-এর সহায়তায় সুলতানা খাতুনের এই সাধারণ বাড়িটি এখন এলাকার কৃষক-কৃষাণীদের জন্য এক 'কৃষি গবেষণাবিলা ও শিক্ষণ কেন্দ্রে' রূপ নিয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন গ্রামের কৃষাণীরা এখানে এসে বীজ সংগ্রহ করেন, নিরাপদ কৃষি বিষযক পরামর্শ নেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
কৃষি ভাবনা জানিয়ে সুলতানা বলেন, “কৃষিতে আমরা এতদিন সার ও কীটনাশকের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। এর বিকল্প হিসেবে আমি পরিবেশবান্ধব জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের চর্চা ছড়িয়ে দিচ্ছি। দূর-দূরান্ত থেকে নারী কৃষাণীরা এলে তাঁদের সঙ্গে নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।”
বীজ ব্যাংকের উপকারিতা সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, “আমাদের কোনো ফসলের বীজের প্রয়োজন হলে আমরা নির্দ্বিধায় সুলতানার কাছে চলে আসি। এখান থেকে আমরা খাঁটি ও দেশীয় জাতের বীজ পাই। তাছাড়া এখান থেকে পাওয়া বীজের মাধ্যমে ফসল ফলালে কোনো বিষের ভয় থাকে না।”
ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক মুক্ত খাদ্য উৎপাদন ও বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বীজের সুরক্ষায় সুলতানা খাতুনের এই উঠান-ভিত্তিক উদ্যোগ আজ পুরো পবা উপজেলার জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।