রাজশাহীতে ৬৯ সার ডিলারের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব॥ অভিজ্ঞতা ছাড়াই ডিলার বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীরা

Political influence in the appointment of 69 fertilizer dealers
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৮ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে ৬৯ সার ডিলারের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব॥ অভিজ্ঞতা ছাড়াই ডিলার বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীরা

​রাজশাহীতে নতুন নিয়োগ পাওয়া ৬৯ জন সার ডিলারের অধিকাংশের বিরুদ্ধে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মীর নামও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে । 

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ কিংবা বিতর্কিত পদে আসীন ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি।

​কৃষি মন্ত্রণালয়ের সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গত ৭ অক্টোবর রাজশাহী জেলার ৬ ৯ জন নতুন সার ডিলারের চূড়ান্ত তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠায়। জেলার একটি সিটি করপোরেশন, ৭২টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌরসভার জন্য ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া চললেও বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার মোট ১৮টি পদের নিয়োগ এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।

​গোপনীয় বৈঠক ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ:-

​খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডিলার নিয়োগের বিতর্কিত এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। বৈঠকে জেলা প্রশাসক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জেলার তিন সংসদ সদস্য সহ মোট পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রস্তাবিত তালিকাটি অনুমোদনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

​জেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মূলত সংসদ সদস্যদের দেওয়া পছন্দক্রমের ওপর ভিত্তি করেই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে থেকে প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও, এমপির পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকার শুরুতেই রাখা হয়েছিল।

​অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের জোর দাবি জানানো হয়েছিল। তবে প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক চাপের মুখে লটারির ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এমনকি নিয়োগ পাওয়া অনেক ব্যক্তির আগে সার কিংবা কৃষিসংক্রান্ত ব্যবসায় কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।

​তণমূলের ক্ষোভ ও স্থানীয়দের বক্তব্য:-

​চারঘাট-বাঘা, তানোর, পুঠিয়া, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও কৃষকদলের পদধারী নেতা অথবা তাঁদের স্ত্রী, সন্তান ও নিকটাত্মীয়। গোদাগাড়ীর একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বলে জানা গেছে।

​গোদাগাড়ী এলাকার ভুক্তভোগী  কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম (৪৫) আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন,

​"আমরা মাঠের কৃষক, সময়মতো সার পাব কি না সেটাই মূল কথা। কিন্তু অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু রাজনীতির পরিচয়ে আর এমপির লোক হয়ে যারা ডিলারশিপ পেল, তারা কাল থেকে ব্যবসা বুঝবে কী? লটারি হলে অন্তত যোগ্য বা সাধারণ কেউ সুযোগ পেত।"

​চারঘাটের স্থানীয়  ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন (৩৮) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আবেদন তো সবাই করেছিল, কিন্তু তালিকা দেখে মনে হচ্ছে দল না করলে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। বড় নেতাদের স্বজন আর পদধারীরাই যদি সব পেয়ে যায়, তবে আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীরা কোথায় যাবে?"

​সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের বক্তব্য:-

​রাজনৈতিক সুপারিশের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি দাবি করেন, “আমরা কোনো তালিকা দিইনি। প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে।”

​অন্যদিকে, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য আব্দুল বারী দলীয় ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বিতর্কিত তালিকা বাতিল ও দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কৃষি সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। এই বিরোধের কারণেই মূলত বাগমারার ১৮টি পদের নিয়োগ আটকে রয়েছে।

​নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং সদস্যসচিব কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁরা কোনো সাড়া দেননি।