জীবনের ঝুঁকিতে ক্রসিংঃ রেলওয়ের ১৫০৫ গেটকিপারের ওপর ‘আধুনিক দাসত্ব’ ও স্থায়ীকরণের দীর্ঘ লড়াই

Crossing at the risk of life
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী :- ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী :- ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন
জীবনের ঝুঁকিতে ক্রসিংঃ  রেলওয়ের ১৫০৫ গেটকিপারের ওপর ‘আধুনিক দাসত্ব’ ও স্থায়ীকরণের দীর্ঘ লড়াই
জীবনের ঝুঁকিতে ক্রসিংঃ রেলওয়ের ১৫০৫ গেটকিপারের ওপর ‘আধুনিক দাসত্ব’ ও স্থায়ীকরণের দীর্ঘ লড়াই

​রেললাইনের ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট্ট  একটি ঘর,কোথাও কাঠের, কোথাও টিনের ঝুপড়ি, কোথাও পাকা বা আধাপাকা ঘর। ২৪ ঘণ্টা ঝুম বৃষ্টি, প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়া, প্রখর রোদ কিংবা তীব্র শীত—যে কোনো আবহাওয়াতেই সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারায় থাকতে হয় তাদের। 


একটি সেকেন্ডের অসাবধানতা মানেই শত শত যাত্রীর প্রাণহানি এবং ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা। অথচ দেশের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক  লেভেল ক্রসিং নিরাপদ রাখা বাংলাদেশ রেলওয়ের অস্থায়ী ও প্রকল্পভিত্তিক গেটকিপাররা (গেটম্যান) নিজেরা বেঁচে আছেন চরম অনিশ্চয়তা, আর্থিক শোষণ এবং মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে।


​২০১৭ ও ২০১৮ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে বেতন বৃদ্ধি ছাড়া রোবটের মত কাজ করে যাওয়া গেইট কিপারেরা   আজ চরম মানসিক নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। চাকরি রাজস্বখাতে স্থানান্তর না হওয়া এবং চিকিৎসার অভাবে আন্দোলনের মাঝেই প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন সহকর্মী।



​বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে নিয়োজিত ১৫০৫ জন গেটকিপারদের কাজের পরিবেশ পর্যালোচনা করলে ফুটে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের দাসত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।

​ ২০১৭ সালে প্রথম এবং ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের অধীনে এই প্রকল্প  গেটকিপারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি চাকরির গেজেট অনুযায়ী দুই বছর নিরিবিছিন্ন চাকরির রাজস্ব করণের নিয়ম থাকলেও, তাদের চাকরি এখনও রাজস্বখাতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দীর্ঘ ৮  বছর ধরে তারা সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ৮,২৫০ টাকা স্কেলের মূল বেতনে আটকে আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়লেও বাড়েনি তাদের আয়।


​অন্যদিকে, সরকারি বা বাৎসরিক কোনো ছুটি নেই এই কর্মীদের। ঈদ, পূজা কিংবা জাতীয় ছুটির দিনেও তাদের কাজ করতে হয়। এমনকি গুরুতর অসুস্থ হলেও ছুটির বিধান নেই। বাধ্য হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে অন্য সহকর্মীকে বুঝিয়ে ডিউটি করাতে হয়, নতুবা ছুটি মেলে না,কাটা হয় বেতন। 

​লোকবল স্বল্পতায়   অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে কর্মীদের একটানা ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। এর ওপর সামান্য ত্রুটি বা সামান্য বিরতির জন্য প্রশাসনিক চাপ, গালিগালাজ এবং বরখাস্তের হুমকি তো নিত্যদিনের ঘটনা।



​আন্দোলনরত এক গেটকিপারের আকুতি:-

গেটকিপাররা বলছেন, "আমরা দিনে-রাতে মানুষের জীবন রক্ষা করি, অথচ আমাদের কোনো ছুটি নেই। অসুখ হলেও ডিউটি করতে হয়, না হয় নিজের পকেটের টাকায় অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে হয়। ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করার পর কর্তৃপক্ষের গালিগালাজ শুনতে হয়। এটা চাকরির নামে এক ধরনের গোলামি ছাড়া আর কিছুই নয়।"


এছাড়া তাদের অভিযোগ, ​প্রকল্পভিত্তিক কর্মচারীদের প্রতি রেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ দিন ধরে চরম উদাসীন ও বিমাতা সুলভ আচরণ করে আসছে । ​চাকরি রাজস্বখাতে স্থায়ীকরণের দাবিতে গেটকিপাররা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, অনশন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করছেন। এই দীর্ঘ আন্দোলনে অর্থাভাব, মানসিক চাপ এবং সময়মতো চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে একাধিক গেটকিপারের করুণ মৃত্যু হয়েছে। সহকর্মীদের এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো গেটকিপার সমাজকে গভীর শোক ও ক্ষোভে নিমজ্জিত করেছে।


​রেলওয়ের শূন্যপদ পূরণ ও নিরাপত্তা জোরদারে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ১৫০৫ জন গেটকিপার/গেটম্যান নিয়োগের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা আজ অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে রয়েছে।

​দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসা গেটকিপাররা আশা করেছিলেন, এই বুঝি  হয়তো তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের আলোর ঝলকানি দেখতে পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা গুড়েবালি হয়ে কেবল দরখাস্ত করার প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।


 রেলওয়ের শূন্যপদ পূরণ ও নিরাপত্তা জোরদারে ২০২৩ সালের ১০ মে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ১৫০৫ জন গেটকিপার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি (সার্কুলার) প্রকাশ করা হয়। সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, রেলওয়ের প্রকল্পে গেটকিপার হিসেবে কমপক্ষে ২ (দুই) বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিলযোগ্য হবে।

​

সার্কুলার প্রকাশের পর প্রকল্পে বছরের পর বছর কাজ করা অভিজ্ঞ গেটকিপারদের আশা ছিল—এই ১৫০৫ পদের মাধ্যমে তাদের চাকরি রাজস্বখাতে স্থায়ী হবে এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে। কিন্তু এরপর আরও চার বছর পার হয়ে গেলেও প্রশাসনিক ধীরগতি এবং রাজস্বখাতে আত্মীকরণের স্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।


আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও মানবিক আহ্বান:-

​আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নীতি অনুযায়ী, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা শ্রমিকদের নিয়মিত ছুটি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, উপযুক্ত মজুরি এবং চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। বছরের পর বছর ছুটিহীন ও নামমাত্র বেতনে ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করানো আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

​

বাংলাদেশ রেলওয়েতে নতুন ট্রেন, আধুনিক ইঞ্জিন ও বিলাসবহুল কোচ যুক্ত হলেও, যেসব গেটকিপার দিনরাত জীবন বাজি রেখে যাত্রীদের নিরাপত্তা দেন, তারা আজ চরম অবহেলিত। দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত ও মানবিক সংকটে থাকা ১৫০৫ জন সহ সকল গেটকিপারের চাকরি দ্রুত রাজস্বখাতে স্থানান্তর করা এখন আর কোনো সাধারণ দাবি নয়—এটি বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। 


সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি ১৫০৫ জন প্রকল্প গেট কিপারদের আকুল আবেদন, অবিলম্বে তাদের দাসত্বতুল্য পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ প্রদান করা হোক।