রেলসেবা বঞ্চিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলা যুক্ত হচ্ছে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের আওতায়
দেশের মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক রেলসেবা পৌঁছে দিতে বড় পরিসরে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে রেলসেবা বঞ্চিত ১০টি জেলাকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে রেল যোগাযোগ থাকা ৪৯ জেলার সঙ্গে নতুন আরও ১০টি জেলা যুক্ত হবে। এতে দেশের ৫৯টি জেলা সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে এবং পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার সরকারি লক্ষ্য পূরণের পথে বড় অগ্রগতি হবে।
ঢাকা রেলভবন কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে মেহেরপুর, শেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও লক্ষ্মীপুরকে নতুন রেল সংযোগের জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও এসব জেলায় সরাসরি রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কোটি মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, পর্যটন, মৎস্য, আমদানি-রপ্তানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম "বিজয়বাংলা নিউজকে" বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য দেশের সব ৬৪টি জেলাকে পর্যায়ক্রমে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।
রেলমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রকল্পগুলোতে শুধু রেললাইন নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ, যাত্রীবাহী কোচ, মালবাহী ওয়াগন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং জনবল নিয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হবে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে।
রেলভবন কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার ৩৬০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ব্রডগেজ, মিটারগেজ ও ডুয়েলগেজ রেললাইন রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টিতে রেল যোগাযোগ থাকলেও ১৫টি জেলা এখনো রেলসেবার বাইরে রয়েছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রেলবঞ্চিত জেলার সংখ্যা কমে পাঁচটিতে নেমে আসবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য দেশের প্রতিটি জেলাকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কপথের তুলনায় রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ কম, জ্বালানি সাশ্রয় বেশি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে কম কার্বন নিঃসরণের কারণে রেল পরিবহন পরিবেশবান্ধব। তাই জাতীয় অর্থনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং টেকসই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে মনে করেন তারা।বিশেষ করে বরিশাল বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগের বাইরে রয়েছে। বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে রেল সংযোগ স্থাপিত হলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগে নতুন গতি আসবে। একইভাবে মেহেরপুর, মাগুরা ও সাতক্ষীরায় রেললাইন নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও শিল্প তথা অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। লক্ষ্মীপুর ও শেরপুরেও রেল সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন ৪শ’র বেশি যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। বছরে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি যাত্রী রেলপথে ভ্রমণ করেন এবং ৮০ থেকে ৯০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়। নতুন রেললাইন নির্মাণের ফলে এই সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। আখাউড়া-সিলেট ও সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ প্রকল্প, ধীরাশ্রমে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি), টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-সিলেট রুটে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ এবং ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলোও এই পরিকল্পনার অংশ। ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন বাস্তবায়িত হলে দুই শহরের মধ্যে রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ৮২ কিলোমিটার কমে আসবে।এ ছাড়া রাজধানীকেন্দ্রিক কমিউটার ট্রেন সেবা সম্প্রসারণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-মানিকগঞ্জ রেল সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে নতুন সুবিধা তৈরি হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রেল নেটওয়ার্কের এই সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বৈষম্য ও পরিবহন খরচ কমবে এবং কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও বাণিজ্য খাত নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতে রেলপথের অবদানও আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব "বিজয়বাংলা নিউজকে"বলেন, ‘সরকার শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণে নয়, সেই রেলপথে কার্যকর ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে রেললাইন নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও কোচের অভাবে যাত্রীদের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এবার নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহের সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য শুধু নতুন জেলা যুক্ত করা নয়; বরং এমন একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে রেললাইন চালুর সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় ট্রেন, কোচ ও লোকোমোটিভও পরিচালনায় থাকবে। এতে যাত্রীসেবার মান বাড়বে এবং রেলভ্রমণ আরও আরামদায়ক ও সময়োপযোগী হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলার মধ্যে কমিউটার ট্রেন সেবা সম্প্রসারণ, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, রেল লেভেল ক্রসিং উন্নয়ন, নতুন আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদে রেল নেটওয়ার্ককে ব্রডগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের রেল যোগাযোগে একটি নতুন যুগের সূচনা হবে।