টানা ভারী বৃষ্টিতে ডুবল নিউমার্কেট, বিপাকে নিম্নআয়ের মানুষ
টানা ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকা। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ব্যবসায়ী, কর্মচারী, ক্রেতা, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। তবে সবচেয়ে বিপাকে নিম্নআয়ের মানুষ।
রোববার (১২ জুলাই) ভোরের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে থাকলে নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে দ্রুত পানি জমতে শুরু করে। বেড়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট, হকার্স মার্কেট এবং মার্কেটসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যানবাহন চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। অনেক রিকশা ও মোটরসাইকেল পানির মধ্যে বিকল হয়ে যায়। অনেক চালককে গাড়ি ঠেলে নিরাপদ স্থানে নিতে দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিউমার্কেটের সামনের প্রধান সড়ক, মার্কেটের প্রবেশপথ, ফুটপাত এবং বিভিন্ন সংযোগ সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি, আবার কিছু এলাকায় কোমরসমান পানি জমে থাকায় মানুষের চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেকে জুতা হাতে নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ আবার বাধ্য হয়ে দীর্ঘক্ষণ কোনো ছাউনির নিচে অপেক্ষা করছেন।
সকালে দোকান খুলতে এসে অনেক ব্যবসায়ী ও কর্মচারীকে পানির মধ্য দিয়ে মার্কেটে প্রবেশ করতে দেখা যায়। অনেক দোকানের সামনের অংশে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্য সরিয়ে উঁচু স্থানে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বর্ষাকালে নিউ মার্কেট এলাকায় এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও মুখে পড়তে হয়।
নুরজাহান মার্কেটের ব্যবসায়ী জামাল বলেন, ‘সকাল থেকে দোকান খুলতেই পারিনি। দোকানের সামনে কোমরসমান পানি। ক্রেতা নেই, কর্মচারীরাও সময়মতো আসতে পারেনি। এভাবে বৃষ্টি হলে পুরো দিনের ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে।’
আরেক দোকান কর্মচারী সোহেল বলেন, ‘প্রতি বছর একই অবস্থা। বৃষ্টি হলেই নিউ মার্কেট ডুবে যায়। পানি নিষ্কাশনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। সমস্যার সমাধানের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না।’
নিউমার্কেট এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা অনেক ক্রেতাও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকে মার্কেটে পৌঁছে পানি দেখে ফিরে গেছেন। আবার কেউ জরুরি প্রয়োজনের কারণে কষ্ট করেই পানির মধ্য দিয়ে মার্কেটে প্রবেশ করেছেন। বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে।
এদিকে নিউমার্কেটসংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। ঢাকা কলেজের প্রধান ফটকেও হাটু সমান পানি, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার এবং আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থীকে ভিজে কাপড় ও ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিউমার্কেটের জলাবদ্ধতার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে ক্ষোভও জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিউমার্কেট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই ড্রেনেজ সংকট রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়া, নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্যবসাকেন্দ্রিক এ এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত থাকলেও স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে বৃষ্টির কারণে যেখানে অনেকেই ঘরে বসে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে দিন এনে দিন খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই বৃষ্টি হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার কারণ।
দুপুর পর্যন্ত নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন ফুটপাত প্রায় ফাঁকাই দেখা গেছে। সাধারণ দিনের মতো দোকান সাজিয়ে বসতে পারেননি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। রাস্তার পাশের চায়ের দোকান, ভাজাপোড়ার দোকান, ফলের দোকান, মুচির ছোট টংঘর, কাপড় ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান অধিকাংশই বন্ধ ছিল। অনেক ব্যবসায়ী ছাউনি বা ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিলেন।
নিউমার্কেটের ফুটপাতে সাধারণত সকাল থেকেই জমে ওঠে ব্যবসা। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন কাজে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে পুরো এলাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ব্যবসা শুরু করার পরিবেশই তৈরি হয়নি।
ফল বিক্রেতা মোরশেদ বলেন, ভোরে দোকানের মালপত্র নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে দোকান সাজানোর সুযোগ পাননি। দুপুর হয়ে গেলেও একটি ফলও বিক্রি করতে পারেননি। প্রতিদিনের বিক্রির টাকাতেই তার সংসার চলে। আজকের দিনটি কীভাবে কাটবে, সেটিই এখন বড় চিন্তা।
মুচি ঋত্বিক কর্মকার বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে মানুষ সাধারণত কম বের হয়। ফলে জুতা মেরামতের কাজও থাকে না। সকাল থেকে বসে থাকলেও কোনো আয় হয়নি। অথচ পরিবারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা ও বাসাভাড়া নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত ভাবতে হয়।’
একটি ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানের কর্মী জালাল বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে বিক্রি শুরু করতে না পারলে দিনের শেষে ভালো আয় হয় না। টানা বৃষ্টিতে চুলা জ্বালানো এবং দোকান সাজানো সম্ভব হয়নি। ফলে পুরো দিনে বিক্রি না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষ জড়িত। তাদের অধিকাংশেরই নির্দিষ্ট মাসিক আয় নেই। প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই চলে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়। তাই একটি দিনের বৃষ্টিও তাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
দুপুর গড়ালেও বৃষ্টি না থামায় নিউমার্কেট এলাকার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনও অপেক্ষা করছেন আকাশ পরিষ্কার হওয়ার। তাদের প্রত্যাশা, অন্তত বিকেলের দিকে যদি বৃষ্টি কমে, তাহলে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও দোকান খুলে কিছু আয় করতে পারবেন। কারণ তাদের কাছে বৃষ্টি শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকা এক কঠিন বাস্তবতা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন মৌসুমি দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে নগর ব্যবস্থাপনার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকা, পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সামান্য সময়ের ভারী বৃষ্টিতেও পানি জমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য এবং নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে দিনের বাকি সময়েও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীর অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ও বৃহৎ বাণিজ্যিক এলাকা নিউমার্কেটের এমন জলমগ্ন চিত্র আবারও প্রশ্ন তুলেছে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সকলেই।