চারদিকে বন্যার পানি, ভেলায় ভাসিয়ে লাশ নেওয়া হলো দূরের কবরস্থানে
চারদিকে থই থই করছে বন্যার পানি। ডুবে আছে চারদিক। এর মধ্যেই এক ব্যক্তির লাশ ভেলায় তুলছেন কয়েকজন। ভেলায় ভাসিয়ে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয় লাশটি। এরপর একটি অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে করা হয় দাফন।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকায় গত শুক্রবার ঘটেছে এ ঘটনা। মারা যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। তিনি পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। তাঁর বাড়ি উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে। শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে মারা যান তিনি। পরে রাতে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।
বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে ফোরকানের ঘর, উঠান, পারিবারিক কবরস্থানসহ পুরো এলাকা ডুবে ছিল। এর মধ্যেই শুক্রবার সকালে বন্যার পানিতে জাল দিয়ে মাছও ধরছেন ফোরকান। তবে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন তিনি। এরপর বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ঘর-উঠান বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় নিজ বাড়িতে লাশের গোসল দেওয়া সম্ভব হয়নি। পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করাও যায়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্যার কারণে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাটে নিয়ে গিয়ে ফোরকানের লাশের গোসল দেওয়াসহ দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়। এরপর ওই এলাকার ফকির মুড়া ঈদগাহ এলাকায় রাত ১০টার দিকে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে সেখানে পাহাড়ের খাস জায়গায় দাফন করা হয় ফোরকানকে। জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম।
জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আজ রোববার দুপুরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এখনো ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। ফোরকানদের বসতবাড়ি, কবরস্থান ও চলাচলের পথ প্লাবিত থাকায় তাঁর লাশ ভেলায় করে শুকনা স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে। এরপর অনেক দূরে সরকারি জায়গায় উন্মুক্ত কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।’
মো. ফোরকানের আরেক ছেলে রাসেল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাড়ির পাশেই আমাদের পারিবারিক কবরস্থান আছে। আমার দাদা-দাদিসহ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের সেখানে কবর দেওয়া হয়েছে। বাবাও বলতেন, তাঁকে যেন দাদা-দাদির পাশেই কবর দিই। কিন্তু বন্যার কারণে বাবার সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হলো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবা যখন মারা যান, তখন আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে কোমরসমান পানি ছিল। তাই বাবাকে দূরের পাহাড়ে কবর দিতে হয়েছে।’
জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, মাছ ধরতে গিয়ে ওই ব্যক্তি স্ট্রোক করেন। পরে বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বন্যা কবলিত এলাকাটি থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে সরকারি খাস জায়গায় লাশটি দাফন করা হয়। ইউএনও বলেন, ‘লাশটি এভাবে ভেলায় ভাসিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত ছিল। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলে আমরা দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতাম।’
টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অনেক এলাকা। তবে গত দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে; যদিও এখনো সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন কমবেশি প্লাবিত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পানিবন্দী হয়ে রয়েছেন প্রায় চার লাখ মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার আজ দুপুরে গণমাধ্যমকে বলেন, সাঙ্গু নদের সাতকানিয়া অংশে পানি এখনো বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাগরে উঁচু জোয়ার থাকায় এবং পাহাড়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি দ্রুত কমছে না।
সাতকানিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে আজ সকাল থেকে আবারও ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় নতুন করে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সূত্র : প্রথম আলো