রাজশাহীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উদযাপিত
ভক্তি, শ্রদ্ধা ও উৎসবমুখর পরিবেশে রাজশাহীতে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে আয়োজিত এই উৎসবকে ঘিরে নগরজুড়ে বিরাজ করছে আনন্দ, ধর্মীয় আবহ ও সম্প্রীতির অনন্য পরিবেশ। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানীর দর্শন এবং তাঁদের আশীর্বাদ লাভের প্রত্যাশায় সকাল থেকেই মন্দিরগুলোতে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথে অধিষ্ঠিত জগন্নাথদেবের দর্শন আত্মিক কল্যাণ ও পুণ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। সেই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করে রাজশাহীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো ভক্ত উৎসবে অংশ নিতে নগরীতে সমবেত হবেন।
রথযাত্রা উপলক্ষে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) রাজশাহী এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী হনুমান জিউর আখড়া মন্দির কমিটি পৃথকভাবে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আয়োজন করে। বিকেলের দিকে নগরীর রেশমপট্টি এলাকার ইসকন মন্দির এবং সাহেববাজার এলাকা থেকে বর্ণাঢ্য রথযাত্রা শুরু হবে।
সুসজ্জিত ও দৃষ্টিনন্দন রথে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানীকে নিয়ে নগর পরিক্রমা শুরু হলে চারদিকে ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। হাজারো ভক্ত রথের দড়ি টেনে ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটান এবং পুণ্য অর্জনের আশায় শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন ।
রথযাত্রাটি নগরীর কুমারপাড়া, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, বাটার মোড়, রানীবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পথের দুই পাশে অবস্থান নেওয়া অসংখ্য নারী-পুরুষ ভক্ত ফুল, ফল ও নানা উপকরণ দিয়ে ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবে এবং আরতি সম্পন্ন করবেন।
সকালের শুরু থেকেই বিভিন্ন মন্দিরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়। বিশ্বশান্তি, দেশের সমৃদ্ধি এবং মানবকল্যাণ কামনায় বিশেষ পূজা, রাজভোগ নিবেদন, ভগবদ্গীতা পাঠ ও সমবেত প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর সাগরপাড়া ও আশপাশের এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী রথের মেলা। মেলায় খেলনা, মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, বাঁশ ও কাঠের সামগ্রী, মিষ্টি-মণ্ডাসহ নানা ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মেলা প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি নগরবাসীর মিলনমেলা ও ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে পরিণত হয়েছে।
উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রথযাত্রার পুরো রুটজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নির্বিঘ্নে উৎসবে অংশ নিতে পারেন।
সনাতন ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী, রথযাত্রার সাত দিন পর ‘উল্টো রথযাত্রা’র মধ্য দিয়ে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানীর নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে এ বছরের রথ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।